বরিশালের উজিরপুরে চুরির অপবাদে মারধরের শিকার অনিক সরদারকে তিন মাসের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। বাবাকে বিদায় দেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়ে তার চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়া মেয়ে তুবা বিনতে অরণী। এ সময় তুবা বারবার বলতে থাকে, ‘আমার বাবা ভালো বাবা, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে।’

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে প্রশাসন ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় উজিরপুরের বামরাইল এলাকার অনিক সরদারকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সেখানে তিন মাস চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে পরিবারের কাছে ফিরবেন।

বাবাকে বিদায় দেওয়ার আগে বাংলানিউজের সঙ্গে কথা বলে তুবা। সে জানায়, শনিবার ভোররাতে এক ছেলে বাড়িতে এসে বাবাকে আটকে মারধরের খবর দেয়। এরপর মা ও ছোট বোনের সঙ্গে সেও দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে গিয়ে বাবাকে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পায় সে।

তুবার ভাষ্য, ‘আমি গিয়ে দেখি বাবাকে বেঁধে রেখে মারছে সবাই। লাঠি দিয়ে বাড়ি দিচ্ছে, লাথি দিচ্ছে। তখন আমি তাদের বলেছি, আমার বাবাকে আর মাইরো না। আমার বাবাকে তোমরা ছেড়ে দেও, আমার বাবাকে তোমরা বেঁধে রেখ না।’

ঘটনাস্থলে বাবাকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখতে পায় তুবা। পরে কেউ একজন চা ও রুটি দিলে সে নিজের হাতে বাবাকে খাওয়ায়। দীর্ঘ সময় ধরে বাবাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করার পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। বাবাকে বাড়িতে ফেরত পাওয়ার পর তুবা অনেক খুশি হয়েছিল বলেও জানায়।

তুবা আরও জানায়, ভোর সাড়ে ৪টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সে ও তার মা বাবাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু সেখানে থাকা কয়েকজন তাদের বিভিন্নভাবে ঘুরিয়ে রাখে। ক্ষুধা লাগলেও বাবার কাছ থেকে সে সরে যায়নি। ওই সময় তার মা ও ছোট বোনও ঘটনাস্থলে ছিলেন।

তুবার অভিযোগ, প্রথম দিকে যারা তার বাবা-মায়ের স্বাক্ষর নিয়েছিল, তারা তাদের ওই দিনই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিল। পরদিনও কয়েকজন তাদের গ্রাম ছাড়ার জন্য চাপ দেয়। পরে ইউএনও ও পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সেখানে যাওয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

তুবার মা জান্নাত বলেন, খবর পাওয়ার পর তারা সবাই ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তুবা স্যান্ডেল পরার সময়ও নেয়নি, সরাসরি বাবার কাছে চলে যায়। মেয়ের সামনে বাবাকে মারধর করা হলেও প্রথমে কেউ তার কান্না ও অনুরোধে সাড়া দেয়নি বলে জানান তিনি।

অনিক সরদার দাবি করেন, পূর্বশত্রুতা ও জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে তাকে চুরির অপবাদ দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। তার কাছ থেকে কোনো চুরি করা মালামাল উদ্ধার হয়নি এবং অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণও দেখানো হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

অনিক বলেন, তার মেয়ে তাকে বাঁধা অবস্থায় মারধর হতে দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। তিনি এখন সবার সহযোগিতায় সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। একই সঙ্গে পরিবারের জন্য একটি কাজের ব্যবস্থা হলে তারা ভালোভাবে বাঁচতে পারবেন বলেও জানান তিনি।

উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা জানান, ঘটনাটি জানার পর রোববার তিনি তুবার বাড়িতে যান। অনিক অনেকটাই অসুস্থ থাকায় তার চিকিৎসার জন্য সোমবার তাকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। তিন মাসের মধ্যে তিনি সুস্থ হয়ে পরিবারের কাছে ফিরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ইউএনও আরও জানান, অনিকের চিকিৎসাকালীন পরিবারের ভরণপোষণসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতায় উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সুশীল সমাজ পাশে থাকবে। এ সময় উজিরপুর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি এসএম আলাউদ্দিন পরিবারটিকে নগদ অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেন।

তুবার বাবাকে বিদায় দেওয়ার পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মেয়ের বাবার প্রতি ভালোবাসা ও তার কান্না। ইউএনও মো. আলী সুজার ভাষায়, অনিকের ঘটনায় মানুষ অনেক কিছু না ভেবে শুধু মেয়ের বাবার প্রতি ভালোবাসার বিষয়টি দেখেছে। এখন পরিবারের প্রত্যাশা, চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরবেন অনিক।