জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলো। কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত থেকে সুন্দরবন, সেন্টমার্টিন, সিলেটের চা-বাগান ও বান্দরবানের পাহাড় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এসব জায়গার ভবিষ্যৎ এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। পর্যটন খাত দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। তাই পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে দুর্যোগসহনশীল করে তোলা এখন সময়ের দাবি।

প্রতি বছর ১৩ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘সহনশীলতার সূচনা ঘর থেকেই’। এই বার্তা বাংলাদেশের পর্যটন খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দুর্যোগের প্রভাব শুধু অবকাঠামোর ক্ষতি করে না, স্থানীয় মানুষের আয়, ব্যবসা ও জীবনযাত্রাকেও বিপর্যস্ত করে। তাই পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশের পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত। কিন্তু উচ্চ জোয়ার, ঘূর্ণিঝড় ও উপকূলীয় ক্ষয়ের কারণে সৈকতের বালু সরে যায় এবং বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও প্রবাল ক্ষয় সেন্টমার্টিনের পরিবেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রবাল নষ্ট হলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার প্রভাব পড়ে স্থানীয় জেলেদের জীবিকা ও প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের ওপর।

সুন্দরবনও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও অস্বাভাবিক জোয়ার বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলে প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে সিলেট ও বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায় অতিবৃষ্টির কারণে ভূমিধস, রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। হাওর অঞ্চলে বন্যা ও দীর্ঘ জলাবদ্ধতা নৌপর্যটন এবং স্থানীয় ব্যবসাকে ব্যাহত করতে পারে। নদীভাঙনে পদ্মার চরাঞ্চলের ঘরবাড়ি ও পর্যটনসুবিধাও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পর্যটন বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন পরিষদের হিসাবে, ২০২৪ সালে ভ্রমণ ও পর্যটন খাত দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের ২ দশমিক ৯ শতাংশে অবদান রেখেছে এবং মোট কর্মসংস্থানের ৪ দশমিক ২ শতাংশকে সমর্থন করেছে। একই বছরে আন্তর্জাতিক পর্যটক থেকে আয় ছিল প্রায় ৪৪ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। ফলে দুর্যোগে পর্যটনকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে হোটেলকর্মী, পরিবহনশ্রমিক, নৌকার মাঝি, গাইড, দোকানি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয়ও কমে যেতে পারে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর ঝুঁকি চিহ্নিত করা জরুরি এবং তথ্য নিয়ে ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণে পরিবেশগত নিয়ম মানা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য সহজ ভাষায় আবহাওয়ার পূর্বাভাস, সতর্কবার্তা, জরুরি যোগাযোগ নম্বর ও নিরাপদ স্থানের তথ্য জানানো দরকার। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের সতর্কতা, উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের প্রস্তুতি এবং নৌপর্যটনে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা ও পরিকল্পনায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে, কারণ এলাকার প্রকৃতি ও ঝুঁকি সম্পর্কে তাঁদের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, দুর্যোগ প্রস্তুতি পর্যটনের বিকাশে বাধা নয়; বরং পর্যটকদের আস্থা বাড়াতে পারে। বাংলাদেশের পর্যটন খাতেও পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিকল্পিত অবকাঠামো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিতে হবে। পর্যটন থেকে অর্জিত আয়ের একটি অংশ সৈকত সংরক্ষণ, বন রক্ষা, প্রবাল পুনর্বাসন ও ভূমিক্ষয় প্রতিরোধে ব্যয় করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করা শুধু পরিবেশের দায়িত্ব নয়, এটি অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকা রক্ষারও বিষয়। জলবায়ু ঝুঁকি উপেক্ষা করে পর্যটনের সম্প্রসারণ ঘটলে ক্ষতির আশঙ্কা বাড়বে। তাই এখন থেকেই দুর্যোগসহনশীল পর্যটনব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে সমুদ্রতীর, বন, পাহাড়, হাওর ও নদীভিত্তিক পর্যটন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও টিকে থাকে।