বাংলাদেশে পরিচালিত বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর টিকিট আন্তর্জাতিক ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি কেনার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে বিদেশ ভ্রমণে ইচ্ছুক বাংলাদেশি যাত্রীরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ট্রাভেল এজেন্সি বা প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে নিজেদের আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহার করে সরাসরি বিমানের টিকিটের মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন। এতে বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিট কেনার প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ (এফইপিডি-১) এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছে। সার্কুলারটি দেশের সব অনুমোদিত ডিলার বা এডি ব্যাংকের কাছে পাঠানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে বৈধ বিদেশ ভ্রমণ-সংক্রান্ত লেনদেনের সুযোগ আরও সহজ করা এবং বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিট কেনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান কিছু জটিলতা কমানো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, বৈধ ভিসা থাকা সাপেক্ষে বাংলাদেশি নাগরিকরা বিদেশ ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশে পরিচালিত বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিট আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহার করে সরাসরি কিনতে পারবেন। অর্থাৎ কোনো বিদেশি এয়ারলাইনসের নিজস্ব ওয়েবসাইট বা অনুমোদিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টিকিট কেনার সময় আন্তর্জাতিক ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করা সম্ভব হবে, যদি সংশ্লিষ্ট লেনদেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত নিয়ম ও শর্তের আওতায় পড়ে।

এই সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক অ্যাকোয়ারিং ও পেমেন্ট সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা। সার্কুলারে বলা হয়েছে, যেসব বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিট বিক্রির অর্থ বাংলাদেশের বাইরে আন্তর্জাতিক অ্যাকোয়ারিং ও পেমেন্ট সেটেলমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়, সেসব টিকিট কেনার ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম প্রযোজ্য হবে। ফলে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা বিদেশি বিমানসংস্থার টিকিট কেনার সময় আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থার ব্যবহার নিয়ে যেসব সীমাবদ্ধতা ছিল, তা কিছুটা সহজ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বিদেশি এয়ারলাইনসের ক্ষেত্রে একটি বড় বিষয় হলো বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন। কোনো কোনো বিমানসংস্থার বাংলাদেশে কার্যক্রম থাকলেও স্থানীয় ব্যাংকের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের নিজস্ব ব্যবস্থা নাও থাকতে পারে। নতুন নির্দেশনার ফলে এমন এয়ারলাইনসের পরিষেবাও আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে গ্রহণ করা সহজ হবে। যাত্রীরা প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে কার্ডের মাধ্যমে টিকিটের মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন।

এতে বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা করা যাত্রীদের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি হতে পারে। আগে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিট কেনার জন্য ট্রাভেল এজেন্সির সহায়তা নিতে হতো অথবা স্থানীয় ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে লেনদেনের ব্যবস্থা করতে হতো। এখন আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহার করে সরাসরি মূল্য পরিশোধের সুযোগ থাকায় অনলাইনভিত্তিক টিকিট কেনার প্রক্রিয়া আরও সহজ হতে পারে। বিশেষ করে যারা নিজেরাই এয়ারলাইনসের ওয়েবসাইটে টিকিট বুক করতে চান, তাদের জন্য এটি কার্যকর সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে এই সুবিধা ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হবে। শুধু আন্তর্জাতিক কার্ড থাকলেই যেকোনো ধরনের বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিট কেনা যাবে—বিষয়টি এমন নয়। সংশ্লিষ্ট যাত্রীর বৈধ ভিসা থাকতে হবে এবং টিকিট কেনার উদ্দেশ্য বিদেশ ভ্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে হবে। পাশাপাশি লেনদেনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও যথার্থতা যাচাই করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিট কেনার এই সুবিধা বার্ষিক নির্ধারিত ‘ভ্রমণ কোটা’র হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে এই ধরনের টিকিট কেনার লেনদেনকে প্রচলিত বার্ষিক ভ্রমণ কোটার সঙ্গে একইভাবে গণনা করা হবে না। এতে বিদেশ ভ্রমণকারী গ্রাহকদের জন্য আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ভ্রমণ কোটার বাইরে রাখার সিদ্ধান্তটি যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত বিদেশ ভ্রমণের সময় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা ও নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। সেই কাঠামোর মধ্যে আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে টিকিট কেনার সুযোগকে আলাদাভাবে বিবেচনা করায় টিকিটের মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের জন্য কিছুটা বাড়তি সুবিধা তৈরি হবে। তবে অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের মতো এখানেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের যাচাই ও নিয়ম মানা প্রয়োজন হবে।

সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, টিকিট ক্রয়ের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও লেনদেনের যথার্থতা যাচাই-বাছাই করার পর সংশ্লিষ্ট ইস্যুকারী ব্যাংক গ্রাহকের কার্ড থেকে নেওয়া অর্থ পুনরায় রিফিল বা সমন্বয় করতে পারবে। অর্থাৎ কোনো লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং টিকিট কেনার বিষয়টি যাচাই করার পর ব্যাংক তার নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে পারবে।

এ ক্ষেত্রে যাত্রীদের টিকিট কেনার প্রমাণ, ভ্রমণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে করা লেনদেন পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের যাচাইয়ের আওতায় আসতে পারে। প্রয়োজনীয় তথ্য বা নথি না থাকলে লেনদেনের সমন্বয় প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।

নতুন নিয়মের ফলে বাংলাদেশে পরিচালিত বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর অনলাইন টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে। আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি পেমেন্টের সুযোগ থাকায় যাত্রীরা এয়ারলাইনসের নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে টিকিট কেনার ক্ষেত্রে আরও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারেন। এতে মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি টিকিট বুকিংয়ের সময় ও প্রক্রিয়া নিয়েও সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।

বিশেষ করে বিদেশে পড়াশোনা, চিকিৎসা, ব্যবসা, চাকরি, পর্যটন কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে যাতায়াতকারী ব্যক্তিদের জন্য সরাসরি টিকিট কেনার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তুতির সময় ভিসা, হোটেল, পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়ের পাশাপাশি বিমান টিকিট কেনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহারের এই সুযোগ সেই ধাপকে আরও সহজ করার পথ তৈরি করেছে।

এ ছাড়া বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠানের স্থানীয়ভাবে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের ব্যবস্থা নেই, তাদের টিকিট কেনার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক কার্ড কার্যকর হতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশে বসে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে টিকিটের মূল্য পরিশোধ করা সম্ভব হবে। তবে কোন এয়ারলাইনসের ক্ষেত্রে এই সুবিধা কার্যকর হবে, তা সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা এবং ব্যাংকের প্রযোজ্য নিয়মের ওপর নির্ভর করবে।

ব্যাংকগুলোর জন্যও নতুন নির্দেশনাটি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে করা সংশ্লিষ্ট লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। গ্রাহকের ভ্রমণের উদ্দেশ্য, ভিসা এবং টিকিট কেনার প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে ব্যাংককে লেনদেনের যথার্থতা নিশ্চিত করতে হবে। ফলে গ্রাহকের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকেও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক কার্ড বলতে সাধারণত এমন ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডকে বোঝায়, যার মাধ্যমে দেশের বাইরে বা আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কে বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন করা যায়। বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিট কেনার ক্ষেত্রে এই কার্ড ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ফলে বাংলাদেশি গ্রাহকের জন্য আন্তর্জাতিক অনলাইন পেমেন্টের একটি নির্দিষ্ট ব্যবহার আরও সহজ হলো। তবে কার্ডের বৈদেশিক লেনদেন সুবিধা, ব্যাংকের অনুমোদন এবং প্রযোজ্য সীমা সম্পর্কে গ্রাহককে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিট কেনার ক্ষেত্রে ট্রাভেল এজেন্সির ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট কেনার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বরং আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি টিকিট কেনার একটি অতিরিক্ত পথ তৈরি হয়েছে। ফলে যাত্রীরা নিজেদের প্রয়োজন ও সুবিধা অনুযায়ী সরাসরি এয়ারলাইনস অথবা ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট কেনার ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্দেশনা বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিট কেনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহারের সুযোগকে আরও বিস্তৃত করেছে। বৈধ ভিসা থাকা বাংলাদেশি নাগরিকরা নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে বাংলাদেশে পরিচালিত বিদেশি বিমানসংস্থার টিকিটের মূল্য আন্তর্জাতিক ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি পরিশোধ করতে পারবেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অ্যাকোয়ারিং ও পেমেন্ট সেটেলমেন্টের মাধ্যমে দেশের বাইরে নিষ্পত্তি হওয়া নির্দিষ্ট লেনদেনও এই সুবিধার আওতায় থাকবে। বার্ষিক ভ্রমণ কোটার বাইরে এই সুবিধা রাখার সিদ্ধান্তও যাত্রীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ভিসা এবং ব্যাংকের যাচাই-বাছাইয়ের নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।