টানা দুই জয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছিল বাংলাদেশ হকি দল। এশিয়ান গেমসে শুরুতে টানা দুই ম্যাচে হারলেও শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়াকে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছিল দলটি। তবে সেই আত্মবিশ্বাস ভারতের বিপক্ষে মাঠে কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। শক্তিশালী ভারতের কাছে একতরফা ম্যাচে ১০-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছে বাংলাদেশ।

জাপানের কাওয়াসাকি জুকো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে শুরু থেকেই আধিপত্য বিস্তার করে ভারত। ম্যাচের তৃতীয় মিনিটেই বাংলাদেশকে পিছনে ফেলে ভারত। অভিষেকের গোলে এগিয়ে যায় তারা। এরপর ম্যাচ যত এগিয়েছে, ভারতের আক্রমণের ধার ততই বেড়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা বেশির ভাগ সময় নিজেদের রক্ষণ সামলাতেই ব্যস্ত ছিলেন।

ম্যাচের শুরুতেই গোল হজম করায় বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরি হয়। দ্রুত সমতা ফেরানোর চেষ্টা করলেও ভারতের রক্ষণ ভাঙতে পারেনি বাংলাদেশ। ভারত একের পর এক আক্রমণ তৈরি করতে থাকে এবং বাংলাদেশের ডি-বক্সে চাপ বাড়াতে থাকে। ফলে প্রথম কোয়ার্টার থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় ভারত।

দ্বিতীয় কোয়ার্টারে ভারতের আক্রমণ আরও তীব্র হয়। ২২তম মিনিটে পেনাল্টি স্ট্রোক থেকে ব্যবধান বাড়ান জুগরাজ সিং। তার গোলে ভারত ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। বাংলাদেশের জন্য ম্যাচে ফেরার সুযোগ তৈরি হলেও তা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

এর পাঁচ মিনিট পরই আবারও গোল পায় ভারত। ২৭তম মিনিটে পেনাল্টি কর্নার থেকে গোল করেন অধিনায়ক হারমানপ্রীত সিং। তার গোলে ভারতের ব্যবধান দাঁড়ায় ৩-০। দ্বিতীয় কোয়ার্টার শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশ আর কোনো গোল করতে পারেনি। ফলে বিরতিতে তিন গোলের লিড নিয়ে মাঠ ছাড়ে ভারত।

তৃতীয় কোয়ার্টার শুরু হওয়ার পরও ভারতের আক্রমণের গতি কমেনি। বরং একের পর এক আক্রমণে বাংলাদেশের রক্ষণকে চাপে রাখে তারা। ৩২তম মিনিটে সুখজিৎ সিং গোল করে ভারতের ব্যবধান ৪-০ করেন। গোল হজম করার পর বাংলাদেশ কিছুটা আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করলেও ভারতের মাঝমাঠ ও রক্ষণে বারবার আটকে যায়।

এরপর ৪০তম মিনিটে আবারও পেনাল্টি কর্নার থেকে গোল করেন হারমানপ্রীত সিং। এটি ছিল ম্যাচে তার দ্বিতীয় গোল। ভারতের স্কোর তখন ৫-০। এই গোলের পর বাংলাদেশের জন্য ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

দুই মিনিটের ব্যবধানে জোড়া গোল করেন শিলানন্দ লাকরা। ৪৪তম ও ৪৫তম মিনিটে পরপর দুটি গোল করে বাংলাদেশের বিপক্ষে ভারতের ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেন তিনি। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে দুই গোল হজম করে বাংলাদেশের রক্ষণ পুরোপুরি চাপে পড়ে যায়।

৪৫তম মিনিটেই আরও একটি গোল করেন হারমানপ্রীত সিং। এর মাধ্যমে ম্যাচে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন ভারতের অধিনায়ক। তার গোলের পর ভারতের স্কোর দাঁড়ায় ৮-০। তৃতীয় কোয়ার্টারের শেষ দিকে বাংলাদেশের সামনে ম্যাচে ফেরার কোনো সুযোগই অবশিষ্ট ছিল না।

শেষ কোয়ার্টারেও ভারতের আধিপত্য অব্যাহত থাকে। ম্যাচের শেষ দুই মিনিটে আরও দুটি গোল করে ভারত। ৫৯তম মিনিটে সঞ্জয় গোল করে স্কোর ৯-০ করেন। এরপর ম্যাচের শেষ মিনিটে মানদীপ সিং গোল করলে ভারতের জয় আরও বড় হয়। শেষ পর্যন্ত ১০-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ।

এই ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের আক্রমণভাগ কার্যত নিষ্প্রভ ছিল। গোলের সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি ভারতের আক্রমণ ঠেকাতেও বেশ সমস্যায় পড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে। বিশেষ করে পেনাল্টি কর্নার ও পেনাল্টি স্ট্রোক থেকে ভারত একাধিক গোল আদায় করে নেয়। ম্যাচের বিভিন্ন পর্যায়ে ভারতের দ্রুত পাসিং ও আক্রমণাত্মক হকি বাংলাদেশের রক্ষণকে চাপে রাখে।

এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের শুরুটাও অবশ্য ভালো ছিল না। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচেই দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ৫-০ গোলে হেরে যায় বাংলাদেশ। এরপর স্বাগতিক জাপানের বিপক্ষেও বড় ব্যবধানে পরাজয় আসে। ওই ম্যাচে বাংলাদেশ ৬-১ গোলে হারে।

টানা দুই ম্যাচে হারের পর অবশ্য ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে বাংলাদেশ। নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দারুণ জয় পায় তারা। ৫-১ গোলের ব্যবধানে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে টুর্নামেন্টে প্রথম জয়ের দেখা পায় বাংলাদেশ। সেই জয়ের পর আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে দলের মধ্যে।

এরপর ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষেও জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। ৩-১ গোলের ব্যবধানে ইন্দোনেশিয়াকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় জয় পায় তারা। দুই ম্যাচে জয় পাওয়ায় ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বাংলাদেশ শিবিরে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। তবে ভারতের বিপক্ষে সেই ধার ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।

ভারতের বিপক্ষে ১০-০ গোলের হার বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই বড় ব্যবধানের পরাজয়। তবে এই ম্যাচের পরও টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের আরও একটি ম্যাচ বাকি রয়েছে। গ্রুপ পর্বের পর বাংলাদেশ এখন স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলবে। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ চীন।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার পঞ্চম থেকে অষ্টম স্থানের স্থান নির্ধারণী ম্যাচটি আগামী ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে। কাওয়াসাকি জুকো স্টেডিয়ামেই হবে ম্যাচটি। ভারতের বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হারের হতাশা পেছনে ফেলে শেষ ম্যাচে নিজেদের সেরাটা দেওয়াই এখন বাংলাদেশের লক্ষ্য।

চীনের বিপক্ষে ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য টুর্নামেন্টে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে রক্ষণ শক্তিশালী করা এবং আক্রমণভাগকে আরও কার্যকর করাই হবে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পেনাল্টি কর্নার ও গোলের সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে উন্নতি করতে হবে দলকে।

এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের যাত্রায় শুরুতে হতাশা থাকলেও পরপর দুই জয় দিয়ে দলটি ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিল। তবে ভারতের বিপক্ষে বড় ব্যবধানের হার সেই ধারায় ছেদ ফেলেছে। এখন শেষ ম্যাচে চীনের বিপক্ষে কেমন পারফরম্যান্স করে বাংলাদেশ, সেটিই দেখার বিষয়।

ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশ গোলের দেখা না পেলেও পুরো টুর্নামেন্টে এর আগে শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে গোল করেছে দলটি। তাই শেষ ম্যাচে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারলে ভালো পারফরম্যান্স করার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের সামনে।

এখন ভারতের বিপক্ষে ১০ গোলের হার ভুলে চীনের বিপক্ষে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিতে হবে বাংলাদেশকে। ১ অক্টোবরের ম্যাচে জয় কিংবা ভালো পারফরম্যান্স দিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করতে পারলে ভারতের বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হারের হতাশা কিছুটা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ থাকবে বাংলাদেশের সামনে।