ম্যানসিটি সমর্থকদের হাতে ফুলানো কলা দেখলে প্রথমে বিষয়টিকে নিছক মজা মনে হতে পারে। কিন্তু লিভারপুলের বিপক্ষে ম্যাচে দেখা যাওয়া এই দৃশ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ম্যানচেস্টার সিটির সমর্থকদের প্রায় চার দশকের পুরোনো এক ঐতিহ্য। ৮০’র দশকের কঠিন সময়ে শুরু হওয়া সেই মজার সংস্কৃতিই এবার আনফিল্ডে আবার আলোচনায় এসেছে।
ম্যানচেস্টার সিটি সমর্থকদের কলা হাতে নেওয়ার গল্পের শুরু ১৯৮৭-৮৮ মৌসুমে। তখন ক্লাবটি ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগ থেকে অবনমিত হয়ে দ্বিতীয় স্তরে নেমে গিয়েছিল। পুরোনো মেইন রোড স্টেডিয়ামে প্লিমাউথ আর্গাইলের বিপক্ষে একটি ম্যাচে ফ্র্যাঙ্ক নিউটন নামে এক ব্যক্তি প্রথম নকল কলা গ্যালারিতে নিয়ে আসেন বলে জানা যায়।
এর পেছনে ছিল ম্যানচেস্টার সিটির তৎকালীন প্রিয় তারকা ইমরে ভারাদিকে ঘিরে এক মজার ঘটনা। সিটির হয়ে ৮১ ম্যাচে ৩১ গোল করেছিলেন এই স্ট্রাইকার। এক সমর্থক তাকে মজা করে ‘ইমরে বানানা’ নামে ডাকেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে কলার সঙ্গে ভারাদির নাম জড়িয়ে যায়।
দল যখন মাঠে ভালো করতে পারছিল না, তখন সমর্থকেরা হতাশার মধ্যেও হাসির খোরাক খুঁজে নেন। প্রথমে ইমরে ভারাদিকে নিয়ে স্লোগান দেওয়া হয়। এরপর গ্যালারিতে কলা নিয়ে আসার বিষয়টি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কথিত আছে, ওই বছরের বক্সিং ডেতে স্টোক সিটির মাঠে ম্যানচেস্টার সিটির প্রায় ১০ হাজার সমর্থক গিয়েছিলেন এবং তাদের অনেকের হাতেই ছিল বিভিন্ন ধরনের কলা।
সেই সময় শুধু ম্যানচেস্টার সিটি নয়, গোটা ইংলিশ ফুটবলই কঠিন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। অনেক স্টেডিয়াম ছিল জরাজীর্ণ। গ্যালারিতে সহিংস সমর্থকদের উপস্থিতিও ছিল বড় সমস্যা। হুলিগানিজমের কারণে ইংলিশ ক্লাবগুলোকে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা থেকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধও করা হয়েছিল। ১৯৮৫ সালের হেইসেল দুর্ঘটনার পর এই নিষেধাজ্ঞা আসে। লিভারপুল ও জুভেন্টাসের ইউরোপীয় কাপ ফাইনালের আগে সমর্থকদের সহিংসতায় সেদিন ৩৯ জন প্রাণ হারান।
এই কঠিন সময়েই ম্যানচেস্টার সিটি সমর্থকদের মধ্যে কলা নিয়ে হাসি-ঠাট্টার সংস্কৃতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সেটি ক্লাবটির সমর্থকদের নিজস্ব ঐতিহ্যে পরিণত হয়। ৮০’র দশকের সেই সংস্কৃতি পরবর্তী সময়েও বিশেষ বিশেষ ম্যাচে ফিরে এসেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
লিভারপুলের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল ম্যানচেস্টার সিটির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক বিরতির পর এটিই ছিল দলের প্রথম ম্যাচ। এর আগে স্বাধীন কমিশনের আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের রায়ের পর ক্লাবকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে ১১৪টিতে সিটি দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। ক্লাবটি অবশ্য সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছে।
এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আনফিল্ডে লিভারপুল সমর্থকদের পক্ষ থেকেও ম্যানচেস্টার সিটিকে ঘিরে বিভিন্ন ব্যানার ও স্লোগান দেখা যায়। সিটির খেলোয়াড়দের মাঠে নামার সময়ও ছিল তীব্র দুয়ো। ম্যাচের আগে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
এর মধ্যেই সিটি সমর্থকেরা পুরোনো অস্ত্রই বেছে নেন। গ্যালারিতে দেখা যায় অসংখ্য বড় আকারের ফুলানো কলা। সমসাময়িক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমর্থকদের একটি সংগঠন এই ম্যাচে এক হাজারের বেশি ফুলানো কলা বিতরণ করেছিল।
তবে কলার এই প্রদর্শন শুধু মজার দৃশ্য ছিল না। কঠিন পরিস্থিতিতেও ক্লাবের পাশে থাকার বার্তাও ছিল এর মধ্যে। কয়েক দশক আগে যখন সিটি দ্বিতীয় স্তরে নেমে গিয়েছিল, তখনও সমর্থকেরা দলকে ছেড়ে যাননি। এবারও আর্থিক অভিযোগ ও সম্ভাব্য শাস্তির আলোচনা চলার মধ্যেও সমর্থকেরা নিজেদের ঐতিহ্য সামনে এনে একই বার্তা দিয়েছেন।
মাঠের লড়াইয়েও অবশ্য শেষ পর্যন্ত হাসি ছিল ম্যানচেস্টার সিটির মুখে। আনফিল্ডে লিভারপুলকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে তারা। এর ফলে কঠিন পরিবেশের মধ্যেও দারুণ এক জয় পেয়েছে সিটি।
ম্যানচেস্টার সিটির দীর্ঘদিনের সমর্থক ও ওয়েসিস গিটারিস্ট নোয়েল গালাঘারও ক্লাবের প্রতি নিজের আনুগত্যের কথা জানিয়েছেন। তার বক্তব্যের মূল কথা, ক্লাব যে পরিস্থিতিতেই পড়ুক না কেন, তিনি সমর্থন করে যাবেন।
সব মিলিয়ে লিভারপুলের বিপক্ষে ম্যাচে ফুলানো কলার দৃশ্যটি শুধু একটি হাস্যরসাত্মক প্রদর্শন ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ম্যানচেস্টার সিটির কঠিন সময়, ইমরে ভারাদিকে ঘিরে তৈরি হওয়া ‘ইমরে বানানা’ ডাক এবং সমর্থকদের পুরোনো সংস্কৃতি। প্রায় চার দশক পরও সেই ঐতিহ্য টিকে আছে, আর আনফিল্ডে লিভারপুলের বিপক্ষে বড় জয়ের দিনে সেটিই আবার ফুটবলপ্রেমীদের নজরে এসেছে।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন