পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএস (PCOS) বর্তমান সময়ে অনেক নারীর কাছেই অত্যন্ত পরিচিত এবং উদ্বেগজনক একটি স্বাস্থ্য সমস্যা। চিকিৎসকদের মতে, এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে শুধুমাত্র ওষুধের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না, বরং দৈনন্দিন জীবনযাপনেও বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি।

নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাবার ও পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি রাতের বেলা ঘুমানোর আগের কিছু নির্দিষ্ট অভ্যাসও পিসিওএস ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে রাতে ঘুমের আগে মোবাইল বা অন্য কোনো পর্দার যন্ত্র ব্যবহার করা, অনেক দেরিতে ভারী খাবার খাওয়া এবং অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাসের কারণে শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। যা সরাসরি বিপাকীয় স্বাস্থ্যে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই পিসিওএস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে রাতে ঘুমানোর আগে বেশ কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন আনা আবশ্যক। প্রথমত, ঘুমাতে যাওয়ার সময় মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার বা টেলিভিশন দেখা পুরোপুরি এড়িয়ে চলা ভালো। কারণ এসব ইলেকট্রনিক যন্ত্র থেকে নির্গত আলো মানুষের ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় 'মেলাটোনিন' হরমোনের উৎপাদনে সরাসরি বাধা দিতে পারে।

যার ফলে রাতে ঘুমের চরম ব্যাঘাত ঘটতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন হরমোনের মাত্রাতেও অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসতে পারে। তাই যাদের পিসিওএস রয়েছে, তাদের জন্য রাতে পর্যাপ্ত ও নির্বিঘ্ন ঘুম নিশ্চিত করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, অনেকেই রাত ১১টা বা ১২টার দিকে রাতের খাবার খেয়ে থাকেন এবং সেই খাবারগুলো অধিকাংশ সময়ই বেশ ভারী বা অস্বাস্থ্যকর হয়ে থাকে। পিসিওএস থাকলে এমন ক্ষতিকর অভ্যাস অবশ্যই এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ পিসিওএসের কারণে এমনিতেই রোগীদের ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার মতো জটিল সমস্যা থাকতে পারে।

এর ওপর রাতে দেরিতে খাবার খাওয়া ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস শরীরের বিপাকক্রিয়া এবং রক্তে শর্করার মাত্রায় ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্য ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে তুলনামূলক হালকা ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি রাতের ওই খাবারে পর্যাপ্ত পরিমাণে আমিষ রাখাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

তৃতীয়ত, ঘুম ও খাবারের একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে চলা। কখনো অনেক তাড়াতাড়ি ঘুমানো, আবার কোনো দিন অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকা—এমন অনিয়মিত জীবনযাপন শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ির ছন্দে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

একইভাবে প্রতিদিন একেক সময়ে ঘুম থেকে ওঠা বা সকালে তাড়াহুড়ো করে সকালের খাবার বাদ দেওয়ার অভ্যাসও শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্যে বাজে প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে ইনসুলিনের সঠিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি নারীদের মাসিকের নিয়মিততাও চরমভাবে ব্যাহত হতে পারে।

তাই পিসিওএস নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, ঘুম থেকে ওঠা এবং নিয়ম মেনে খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। তবে শুধু রাতের অভ্যাস পরিবর্তন করলেই হবে না, পিসিওএস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে সামগ্রিক জীবনযাপন বা লাইফস্টাইলেই পরিবর্তন আনা গুরুত্বপূর্ণ।

রাতের এসব স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা ও পুষ্টিকর খাবারের দিকেও কড়া নজর দিতে হবে। প্রয়োজনে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক চিকিৎসা নেওয়াও জরুরি।