মার্কিন প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে ইরানের সামরিক শক্তি কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে সাম্প্রতিক এক গোপন গোয়েন্দা মূল্যায়নে উঠে এসেছে ভিন্ন বাস্তবতা। নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা আবারও দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়েছে এবং দেশটির অধিকাংশ সামরিক ঘাঁটি পুনরায় সক্রিয় অবস্থায় ফিরেছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান তাদের ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনা, মোবাইল উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর ওপর আবারও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির আশপাশের ঘাঁটিগুলো পুনরায় সচল হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির আশপাশে থাকা ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে অন্তত ৩০টি আবার কার্যকর অবস্থায় ফিরেছে। এই ঘাঁটিগুলো থেকে ইরান চাইলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, তেলবাহী জাহাজ কিংবা আঞ্চলিক সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। প্রতিদিন বৈশ্বিক তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে চলাচল করে। ফলে এই অঞ্চলে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরান এখনো তাদের মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে এসব মোবাইল লঞ্চার ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্র স্থানান্তর এবং সীমিত পরিসরে উৎক্ষেপণের সক্ষমতাও বজায় রয়েছে। কেবলমাত্র তিনটি ঘাঁটি এখনো সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর অবস্থায় আছে বলে দাবি করা হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ইরান তাদের যুদ্ধপূর্ব ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের প্রায় ৭০ শতাংশ ধরে রাখতে পেরেছে। একই সঙ্গে দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ মোবাইল উৎক্ষেপণ যান এখনো ব্যবহারের উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উভয় ধরনের অস্ত্রই রয়েছে।
এছাড়া ইরানের ভূগর্ভস্থ সামরিক অবকাঠামোর বড় অংশ আবারও সচল হয়ে উঠেছে। দেশজুড়ে থাকা প্রায় ৯০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্র আংশিক কিংবা পুরোপুরি কার্যকর অবস্থায় ফিরেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই তথ্যগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী Pete Hegseth-এর পূর্ববর্তী বক্তব্যের সঙ্গে স্পষ্ট বিরোধ তৈরি করেছে। তারা বারবার দাবি করেছিলেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে এবং দেশটির প্রতিরক্ষা কাঠামো বহু বছরের জন্য অকার্যকর হয়ে গেছে।
গত মার্চে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি “সম্পূর্ণ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে” এবং দেশটির “সামরিকভাবে আর কিছু অবশিষ্ট নেই”। পরে এপ্রিল মাসে পিট হেগসেথও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ অভিযানে ইরানের সামরিক শক্তি দীর্ঘ সময়ের জন্য পঙ্গু হয়ে পড়েছে। তবে সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়ন সেই বক্তব্যকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাদের সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে, এই সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে মার্কিন বাহিনীকে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় এক হাজার ১০০টি দূরপাল্লার স্টেলথ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। পাশাপাশি এক হাজারের বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় এক হাজার ৩০০টি প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করা হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এত বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র পুনরায় উৎপাদন ও মজুত করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। বিশেষ করে উন্নত প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি বর্তমান নাজুক যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। নতুন সংঘাত শুরু হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকেও আরও গভীর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপে পড়তে হতে পারে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত শুধু অস্ত্রভান্ডারের ওপর নয়, সামরিক ব্যয় এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়লেও এখনো কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তবে সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য প্রমাণ করছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে পুরোপুরি দুর্বল মনে করার সুযোগ আপাতত নেই।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন