ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বড় কর্মসূচি বাস্তবায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে উপকারভোগী নির্বাচন, তথ্যের নির্ভুলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সফটওয়্যারের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে কারা ভাতা পাওয়ার যোগ্য। তবে মাঠপর্যায়ে ভুল তথ্য, প্রকৃত দরিদ্র পরিবারের বাদ পড়া এবং অযোগ্য ব্যক্তির তালিকাভুক্তি ঠেকানোই হবে এই উদ্যোগের বড় পরীক্ষা।

গত ১২ অক্টোবর থেকে দেশজুড়ে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ শেষ করে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য কেন্দ্রীয় ডেটাবেইজে যুক্ত করা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন করে প্রায় ৪০ লাখ নারী পরিবারপ্রধানকে মাসে আড়াই হাজার টাকা করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০২৬’ অনুযায়ী, দেশের পরিবারগুলোকে আর্থসামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করা হবে অতি দরিদ্র, দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। তবে নগদ সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থাকবে প্রথম তিন শ্রেণির যোগ্য নারী পরিবারপ্রধানদের জন্য।

পরিবারের আয়, সম্পদ, সদস্যদের পেশা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা, বসতবাড়ির অবস্থা এবং জমির পরিমাণসহ বিভিন্ন সূচক বিবেচনায় নিয়ে প্রক্সি মিন্স টেস্ট বা পিএমটি পদ্ধতিতে স্কোর নির্ধারণ করা হবে। সরকারি গেজেট অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে ৮৬০ বা তার কম স্কোর পাওয়া পরিবারকে সহায়তার যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে নির্দিষ্ট কিছু অযোগ্যতার শর্তও রয়েছে।

পরিবারের নারীপ্রধান নিয়মিত সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বেতনভুক্ত কর্মী হলে কিংবা নির্দিষ্ট ধরনের পেনশন পেলে ভাতা পাওয়ার অযোগ্য হতে পারেন। পরিবারের সদস্যদের নামে নির্ধারিত সীমার বেশি সঞ্চয় বা বিনিয়োগ, মোটরযান, বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কিংবা নির্দিষ্ট সীমার বেশি জমি ও সম্পদ থাকলেও ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা আসতে পারে।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, তথ্য সংগ্রহকারীদের কাজ শুধু সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা। কে ভাতা পাবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁরা নেবেন না; সফটওয়্যার সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে যোগ্যতা নির্ধারণ করবে। সরকারের দাবি, এ ব্যবস্থায় রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে সুবিধা দেওয়া কিংবা বঞ্চিত করার সুযোগ কমবে।

তবে সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করলেই অনিয়ম পুরোপুরি বন্ধ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। মাঠপর্যায়ে ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য দেওয়া হলে সফটওয়্যারের মাধ্যমেও প্রকৃত দরিদ্র পরিবার বাদ পড়ে যেতে পারে। তাই তথ্য যাচাই, স্বাধীন তদারকি এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, সারা দেশে ৬৬ হাজার ৮১৫ জন তথ্য সংগ্রহকারী ও ৬ হাজার ৬৮১ জন সুপারভাইজার কাজ করছেন। প্রতিটি পরিবার থেকে বিশেষায়িত ট্যাবলেটের মাধ্যমে প্রায় ৫০ থেকে ৫১টি প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহ করা হবে। দুর্গম এলাকা ও ইন্টারনেট সংযোগবিহীন স্থানে অফলাইনে তথ্য সংগ্রহ করে পরে কেন্দ্রীয় সার্ভারে যুক্ত করার ব্যবস্থাও রয়েছে। পাশাপাশি নমুনাভিত্তিক পুনঃযাচাই ও তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নের বিধান রাখা হয়েছে।

ভুল তথ্যের কারণে কোনো পরিবার বাদ পড়লে বা অযোগ্য কেউ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলে অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকবে। ইউনিয়ন পরিষদের নির্ধারিত সেবাকেন্দ্রের পাশাপাশি অনলাইনেও অভিযোগ জমা দেওয়া যাবে। নীতিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা শহর বাস্তবায়ন কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে হবে। সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে জেলা পর্যায়ে আপিল করা যাবে। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে গণশুনানির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

এই কর্মসূচির আওতায় বিপুলসংখ্যক পরিবারের আয়, সম্পদ, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কেন্দ্রীয় ডেটাবেইজ তৈরি করা হবে। তথ্য সুরক্ষায় এনক্রিপশন, দায়িত্ব অনুযায়ী তথ্য ব্যবহারের অনুমতি এবং ডিজিটাল অডিটের বিধান রাখা হয়েছে। তবে এত বড় তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে উঠবে।

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীনের মতে, ফ্যামিলি কার্ডের লক্ষ্য শুধু অর্থ বিতরণ নয়; সহায়তা নারীদের জীবনযাত্রায় কী পরিবর্তন আনছে, সেটিও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পাইলট কর্মসূচিতে ১ লাখ ১২ হাজার ৯৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহের পর যাচাই-বাছাই শেষে ৭১ হাজার ৮৩১ নারী পরিবারপ্রধানকে কার্ড ও ভাতার আওতায় আনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, ভুল তথ্যের কারণে দরিদ্র মানুষের বাদ পড়া এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবে অযোগ্য ব্যক্তির সুবিধা পাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলা করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতে, কর্মসূচির সাফল্য শুধু কতজন কার্ড পেলেন, তা দিয়ে নয়; প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো এবং তাঁদের জীবনমান কতটা উন্নত হলো, তা দিয়ে বিচার করা উচিত।