রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। বৃহস্পতিবার আদালতে মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে ঘাতক দম্পতির এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন রাষ্ট্রপক্ষের সংশ্লিষ্ট আইনজীবী। লোমহর্ষক ও নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় তুলেছে।
আদালতে শুনানি চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুল রহমান দুলু বলেন, মামলার সাক্ষীদের দেওয়া জবানবন্দি, জব্দ করা আলামত এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এমন জঘন্য ও পাশবিক অপরাধের জন্য সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া আবশ্যক। তিনি আদালতের কাছে আসামিদের কোনো ধরনের অনুকম্পা না দেখিয়ে কঠোরতম শাস্তির জোর দাবি জানান।
ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজের অপরাধ স্বীকার করে আদালতের কাছে ১৬৪ ধারায় একটি লোমহর্ষক জবানবন্দি দিয়েছিল। জবানবন্দিতে সে বলেছিল, সে মিরপুরের ওই বাসার তৃতীয় তলায় তার স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া থাকত এবং সেই ফ্ল্যাটের অন্য বাসিন্দারা সকালে নিজ নিজ কাজে বাইরে চলে যেত। সে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের মাদক গ্রহণ করত এবং ঘটনার দিনও সে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বাসায় অবস্থান করছিল।
নেশার ঘোরে থাকা অবস্থায় সোহেল রানা দেখতে পায় যে পাশের বাসার আট বছরের ফুটফুটে শিশু রামিসা একা একা তাদের বাসার বাইরে খেলাধুলা করছে। তখন সে চতুরতার আশ্রয় নিয়ে শিশুটিকে কৌশলে নিজের ঘরের ভেতরে ডেকে আনে এবং ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। এরপর সে শিশু রামিসাকে জোরপূর্বক বাথরুমে নিয়ে যায় এবং সেখানে তাকে পাশবিকভাবে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়।
সোহেল রানার এই আকস্মিক ও ভয়াবহ আচরণে আতঙ্কিত হয়ে শিশু রামিসা যখন জোরে চিৎকার করতে শুরু করে, তখন ঘাতক সোহেল তার মুখ শক্ত করে চেপে ধরে। চিৎকার বন্ধ করতে সে শিশুটির মুখে একটি ওড়না শক্ত করে বেঁধে দেয় এবং এরপর অবুঝ শিশুটির ওপর তীব্র পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ চালায়। নির্যাতনের একপর্যায়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শ্বাসকষ্টের কারণে শিশু রামিসা জ্ঞান হারিয়ে সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
শিশুটিকে নিস্তেজ ও অজ্ঞান অবস্থায় দেখে ঘাতক সোহেল রানা মনে করে যে রামিসা হয়তো ইতিমধ্যেই মারা গেছে এবং এরপর সে লাশ গুম করার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সে ঘর থেকে একটি ধারালো ছুরি এনে অত্যন্ত নির্মমভাবে শিশুটির মাথা শরীর থেকে কেটে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর সে রামিসার হাত কেটে শরীর থেকে আলাদা করার চেষ্টা করতে থাকে যেন লাশটি সহজে লুকিয়ে ফেলা যায়।
ঠিক সেই নৃশংস মুহূর্তেই শিশু রামিসার মা তার মেয়েকে না পেয়ে চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন এবং একপর্যায়ে সোহেল রানার দরজার বাইরে রামিসার জুতা পড়ে থাকতে দেখেন। বাইরে জুতা দেখে সন্দেহ হলে রামিসার মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে ডাকাডাকি শুরু করেন এবং ভেতরে কী হচ্ছে তা জানতে চান। রামিসার মায়ের আকস্মিক উপস্থিতি ও ডাকাডাকি শুনে ঘরের ভেতরে থাকা ঘাতক সোহেল রানা চরম ভয় পেয়ে যায়।
ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সোহেল রানা দ্রুত ঘরের ভেতরে থাকা একটি সেলাইরেঞ্জ দিয়ে জানালার গ্রিল কেটে পেছনের অংশ দিয়ে বাইরে পালিয়ে যায়। তবে পুলিশ অত্যন্ত তত্পরতার সাথে অভিযান চালিয়ে ঘাতক সোহেল রানা এবং এই হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। গ্রেপ্তারের পর থেকেই এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।
বর্তমানে আদালতে এই চাঞ্চল্যকর মামলার যুক্তিতর্কে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য ও শুনানি গ্রহণের কাজ চলমান রয়েছে। তবে আজ যুক্তিতর্ক শুনানি আদালতে শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে হঠাৎ করেই অসুস্থতা অনুভব করেন সোহেল রানার স্ত্রী ও মামলার অন্যতম আসামি স্বপ্না আক্তার। এরপর কারাকর্তৃপক্ষ ও আদালতের নির্দেশে তাকে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং সুস্থ হওয়ার পর পুনরায় কাঠগড়ায় তোলা হয়।
এর আগে গত মঙ্গলবার এই মামলার শুনানিতে শিশু রামিসার বাবা, মা, বোন, নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশী, প্রত্যক্ষদর্শী এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৬ জন আদালতে উপস্থিত হয়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য প্রদান করেন। গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীর ওই বাসাটি থেকে আট বছরের শিশু রামিসার খণ্ডিত ও রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় থানা পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের পর ছায়া তদন্ত শুরু করে অপরাধীদের শনাক্ত করা হয়।
পুলিশের তদন্তে উঠে আসে যে, গ্রেপ্তারকৃত সোহেল রানা একজন অভ্যাসগত অপরাধী ও মাদকাসক্ত ব্যক্তি এবং তার এই জঘন্য অপরাধের পেছনে তার স্ত্রীরও পরোক্ষ ভূমিকা ছিল। বিজ্ঞ আদালতের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করে সোহেল রানা যেভাবে জবানবন্দি দিয়েছে, তা শুনে আদালতের উপস্থিত সকলেই স্তব্ধ হয়ে যান। রাষ্ট্রপক্ষ মনে করে, এই জবানবন্দিই আসামিদের সাজা নিশ্চিত করার জন্য অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, এই মামলার রায় দ্রুতই ঘোষণা করা হতে পারে এবং এলাকাবাসীও ঘাতকদের ফাঁসির দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। শিশু রামিসার পরিবার ও স্থানীয় সাধারণ মানুষ এখন আদালতের দিকে তাকিয়ে আছেন একটি ন্যায়সংগত ও দৃষ্টান্তমূলক রায়ের প্রত্যাশায়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আশাবাদী যে, অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে সমাজ থেকে এমন জঘন্য অপরাধের প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন