জাতীয় ক্রিকেট লিগ শুরু হলো এবার একেবারেই নতুন আবহে। দেশের ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে টসের সময় অধিনায়কদের ব্লেজার পরার নতুন রীতি দিয়ে শুরু হয়েছে এবারের আসর। চার ভেন্যুতে একসঙ্গে মাঠে গড়ানো প্রথম দিনেই আট অধিনায়ককে দেখা গেছে ব্লেজার গায়ে টস করতে। ২৩ বছর বয়সী বরিশালের অধিনায়ক ইফতেখার রহমান যেমন মেরুন ব্লেজারে ছিলেন, তেমনি তাঁর বিপরীতে খুলনার অভিজ্ঞ অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুনকেও দেখা গেছে একই সাজে। মাঠের ক্রিকেট শুরুর আগেই এই দৃশ্য তৈরি করেছে আলাদা আকর্ষণ।

জাতীয় ক্রিকেট লিগে এবার শুধু ব্লেজারই নতুন নয়, অধিনায়কদের জন্য আলাদা ক্যাপ ও হেলমেটও যুক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম শ্রেণির প্রতিযোগিতাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। ক্রিকেটারদের আর্থিক সুবিধাতেও এসেছে পরিবর্তন। গত এক বছরের ব্যবধানে প্রথম শ্রেণির ম্যাচ ফি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে ক্রিকেটারদের বেতনও। সুযোগ-সুবিধা বাড়ার সঙ্গে পারফরম্যান্সের প্রত্যাশাও যে বাড়বে, সেটিও পরিষ্কার। কারণ আগামী ৭ অক্টোবর থেকে প্রথমবারের মতো শুরু হচ্ছে জাতীয় লিগের ‘সেকেন্ড ইলেভেন’ প্রতিযোগিতা। মূল দলে জায়গা হারানো ক্রিকেটারদের সেখানে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ থাকবে, আবার ভালো পারফরম্যান্স করলে ফিরেও আসতে পারবেন মূল দলে।

তবে নতুন সাজে শুরু হলেও জাতীয় ক্রিকেট লিগের প্রথম দিনটি ব্যাট-বলের উত্তেজনায় খুব বেশি জমেনি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে জাতীয় দলের সঙ্গে থাকা ক্রিকেটারদের অনেকেই খেলছেন না। ফলে চার ম্যাচের কোথাও সেঞ্চুরি দেখা যায়নি, কোনো বোলারও পাঁচ উইকেট নিতে পারেননি। এমনকি প্রথম দিনেই কোনো দল অলআউটও হয়নি। মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ঢাকার বিপক্ষে খেলতে নেমে রংপুরকে কিছুটা পরীক্ষা দিতে হয়েছে। চোট ও জাতীয় দলের ব্যস্ততার কারণে দলের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার ছিলেন না। এরপরও অনিক সরকার ও মিম মোসাদ্দেকের ফিফটিতে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা দিন শেষ করেছে ৬ উইকেটে ২২৯ রান নিয়ে।

চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে রাজশাহীর শুরুটা ছিল আরও ভালো। চট্টগ্রামের বিপক্ষে দলের দুই ওপেনার সাব্বির হোসেন ও হাবিবুর রহমান মিলে গড়েন ১১৪ রানের জুটি। দুজনই ফিফটি তুলে নিলেও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। টি-টোয়েন্টিতে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত হাবিবুর থামেন ৭৫ রানে, সাব্বির করেন ৭১। তাঁদের বিদায়ের পরও রাজশাহীর ইনিংস এগিয়েছে। প্রথম দিন শেষে ৬ উইকেট হারিয়ে ২৮৯ রান করেছে দলটি। অর্থাৎ দ্বিতীয় দিনে বড় সংগ্রহের সুযোগ এখনো রয়েছে রাজশাহীর সামনে।

খুলনা বিভাগীয় স্টেডিয়ামে বরিশালের বিপক্ষে স্বাগতিক ব্যাটসম্যানরাও দিনটি ভালোভাবেই কাটিয়েছেন। সবচেয়ে বড় আলোচনায় ছিলেন অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন। তাঁর সঙ্গে ব্যাট হাতে দারুণ সময় কাটিয়েছেন গত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে খেলা কালাম সিদ্দিকী। দুজনই সেঞ্চুরির কাছাকাছি গিয়েছিলেন। কালাম ৯২ রানে এবং মিঠুন ৮৯ রানে আউট হন। তাঁদের ইনিংসের ওপর ভর করে প্রথম দিন শেষে খুলনার সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ৫ উইকেটে ৩২৮ রান। অন্যদিকে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ময়মনসিংহের ব্যাটসম্যানদের দিনটি তুলনামূলক কঠিন ছিল। ওপেনার মাহফিজুল ইসলাম ছাড়া আর কেউ ফিফটির দেখা পাননি। শেষ বিকেলে ৪৬ রানে অপরাজিত থাকা আবু হায়দারের ইনিংসেই অলআউট এড়ায় ময়মনসিংহ। দিন শেষে সিলেটের বিপক্ষে তাদের রান ৭ উইকেটে ২৭৩।

জাতীয় ক্রিকেট লিগের প্রথম দিনের সবচেয়ে বড় গল্প তাই মাঠের পরিসংখ্যান নয়, বরং নতুনত্ব। জাতীয় দলের অনেক ক্রিকেটার না থাকায় ম্যাচগুলোতে তারকাখচিত উত্তেজনা কম ছিল। তবে নতুন ব্লেজার, আলাদা ক্যাপ-হেলমেট, বাড়তি আর্থিক সুবিধা এবং সেকেন্ড ইলেভেন—সব মিলিয়ে ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট। প্রথম দিন ব্যাটসম্যানদের বড় কোনো ব্যক্তিগত ইনিংস দেখা না গেলেও নতুন এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে ক্রিকেটারদের জন্য প্রতিযোগিতার পরিধি আরও বাড়ছে। এখন দেখার বিষয়, পরের দিনগুলোতে নতুন এই সাজের সঙ্গে মাঠের ক্রিকেট কতটা জমে ওঠে।