দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনি ও সংঘবদ্ধ হামলায় প্রাণহানির ঘটনা বাড়তে থাকায় ‘মব’ পরিচয়ের আড়ালে পরিকল্পিত অপরাধের দায় চাপা পড়ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যা এবং ঢাকার ধামরাইয়ে এক ছাত্রদল নেতাকে তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগ নতুন করে বিষয়টি সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, হামলাকারীদের পাশাপাশি উসকানিদাতা ও পরিকল্পনাকারীদেরও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে গণপিটুনিতে অন্তত ১৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৬৩, চট্টগ্রামে ৩৯ এবং খুলনায় ২২ জন মারা গেছেন। অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ১৩৭টি ঘটনায় ৫৪ জন নিহত এবং ১৪৫ জন আহত হয়েছেন। দুই সংগঠনের হিসাবের সময়সীমা ও পদ্ধতি আলাদা হলেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট।

সাতক্ষীরার দেবহাটায় গত ১৩ অক্টোবর শামীমকে হত্যার ঘটনায় পরিবারের অভিযোগ, পারিবারিক বিরোধের সময় তার কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই অডিওতে ধর্মীয় কটূক্তি রয়েছে দাবি করে স্থানীয় এক ব্যক্তি ফেসবুক লাইভে লোকজনকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপর শামীমের ওপর হামলা হয়। পরিবারের দাবি, চিকিৎসাধীন অবস্থাতেও তার ওপর আবার হামলা চালানো হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় শামীমের বড় ভাইয়ের করা হত্যা মামলায় ফজলুল হককে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে। পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে, ধামরাইয়ে ছাত্রদল নেতা মাহফুজুর রহমান ইমন অভিযোগ করেছেন, একাধিক মোটরসাইকেলে আসা ব্যক্তিরা তার গাড়ির পথ আটকে তাকে তুলে নিয়ে মারধর করেন। এ ঘটনায় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মোকসেদ ও তার অনুসারীদের দায়ী করেছেন তিনি। তবে মোকসেদের স্ত্রী ও বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান পারভীন হাসান প্রীতি অভিযোগ অস্বীকার করে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। পুলিশ ইমনের গাড়ি থেকে গাঁজা উদ্ধারের দাবি করলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। ফলে ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি সায়েদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, সংঘবদ্ধ অপরাধ হলেই সেটিকে সাধারণ মব সহিংসতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পরিকল্পিত হত্যা বা গুরুতর হামলার অভিযোগ থাকলে অপরাধের ধরন অনুযায়ী তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বিপুলসংখ্যক মানুষ একসঙ্গে আইন অমান্য করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয় বলেও জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক এবং মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলামও মব সহিংসতা প্রতিরোধে সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সহিংসতার সূত্রপাত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি, হামলায় নেতৃত্ব এবং সম্ভাব্য পরিকল্পনার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। পাশাপাশি আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।