ইরানি রিয়ালের পতন এবার রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাত এবং নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কার মধ্যে রোববার (২৩ আগস্ট) তেহরানের খোলা বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময়মূল্য ২০ লাখ রিয়ালে উঠে যায়। এর মধ্য দিয়ে দেশটির মুদ্রা ইতিহাসের অন্যতম বড় দরপতনের মুখে পড়েছে।
ইরানি রিয়ালের পতনের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক চাপের ঠিক আগমুহূর্তে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন। এর আগে তিনি সম্ভাব্য নতুন নিষেধাজ্ঞাকে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইরানের অর্থনীতি অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ের সংঘাত শুরুর আগেই নানা সমস্যার মধ্যে ছিল। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশটির সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। নতুন করে রিয়ালের মূল্য কমে যাওয়ায় সেই চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দরপতন আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। ইরানকে বিভিন্ন পণ্য ও কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হলে বাজারে পণ্যের দামও বাড়তে পারে। এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশটির অর্থনীতি ইতোমধ্যেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল প্রবৃদ্ধির চাপে রয়েছে।
নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ওয়াশিংটন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশটির সঙ্গে ব্যবসা করা বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের ওপরও চাপ প্রয়োগের কথা বলছে। এর লক্ষ্য ইরানের তেল বিক্রি, আর্থিক লেনদেন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও সীমিত করা।
ইরানের পক্ষ থেকে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকিকে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, এ ধরনের চাপ তেহরানকে পরাজিত করতে পারবে না।
এর মধ্যেই ইরানের অর্থনীতির ওপর চলমান সংঘাতের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর দেশটির বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় অর্থনীতির ওপর চাপও ক্রমেই বাড়ছে। একই সময়ে ইরানের রিয়াল আরও দুর্বল হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে পরিস্থিতিও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে অনুমোদনহীন তেলবাহী ট্যাঙ্কারের চলাচলে বাধা দিচ্ছে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ। এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এর প্রভাব ইতোমধ্যে তেলের বাজারে দেখা যাচ্ছে। তবে সোমবারের বাজারে বিনিয়োগকারীরা নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত ঘোষণার অপেক্ষায় থাকায় তেলের দামে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতাও দেখা গেছে।
ইরানের অভ্যন্তরেও অর্থনৈতিক চাপ কমানোর নানা চেষ্টা চলছে। দেশটির সরকার জ্বালানি ভর্তুকির ব্যয় বহন করতে সমস্যায় পড়ছে এবং জ্বালানির দাম বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। কিন্তু অতীতে জ্বালানির দাম বাড়ানোকে কেন্দ্র করে ইরানে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। ফলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবেও ঝুঁকিপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ইরানের অর্থনীতি সংকুচিত হতে পারে। সংঘাত, অবকাঠামোগত ক্ষতি, নিষেধাজ্ঞা এবং বাণিজ্যিক বাধার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর সঙ্গে মুদ্রার ব্যাপক দরপতন যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, একটি দেশের মুদ্রার দ্রুত অবমূল্যায়ন শুধু বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, আমদানি ব্যয়, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং ব্যবসায়িক আস্থার বিষয়ও জড়িত। ইরানের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে নতুন সংঘাত যুক্ত হওয়ায় সংকটের বহুমাত্রিক প্রভাব তৈরি হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ইরানি রিয়ালের পতন দেশটির অর্থনৈতিক সংকটের গভীরতা নতুন করে সামনে এনেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার চাপ, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা—সব মিলিয়ে তেহরানের অর্থনীতি কঠিন সময় পার করছে। সামনে নতুন নিষেধাজ্ঞার পর রিয়ালের বাজারে পরিস্থিতি আরও কোন দিকে যায়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন