যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ও সংঘাতের অবসানের লক্ষ্যে এবার নতুন একটি চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। এই প্রস্তাবের আওতায় মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই রূপরেখা তুলে ধরেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সাংবাদিকদের জানান, কাঙ্ক্ষিত শর্তগুলো পূরণ করা হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব। এই শর্তগুলো নতুন কিছু নয়, বরং গত জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) এগুলোর বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এই প্রস্তাবটি ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো হয়েছে। অঞ্চলটিতে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে বলে জানিয়েছেন আরাগচি।
ইরানের এই আকস্মিক প্রস্তাবের বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের মনোভাবও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। এক মার্কিন কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন যে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইতিবাচক আলোচনা চলছে এবং এসব আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও কথা হচ্ছে। যদিও চলতি সপ্তাহেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার কড়া হুমকি দিয়েছিলেন, তবুও পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা থেমে নেই।
হরমুজ প্রণালি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, ইরানিরা হরমুজ প্রণালি নিয়ে তাদের অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে। দীর্ঘ সাত মাস ধরে চলা এই সংঘাতের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের ব্যবহৃত মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হতো। এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামে ব্যাপক ওঠানামা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি সংঘাত অবসানের পথ খুঁজে বের করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপরও একধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই চাপ আরও তীব্র হচ্ছে।

জাতিসংঘে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আরাগচি স্পষ্ট করেছেন যে, চুক্তিতে পৌঁছানো এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরিকতা থাকলে ইরান এখনই সবকিছু প্রস্তুত রেখেছে। স্বাভাবিক নৌ চলাচল শুরু করতে যুক্তরাষ্ট্রকে যেসব পদক্ষেপ নিতে হবে, তা গত ১৮ জুন স্বাক্ষরিত ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকে উল্লেখ করা আছে। ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে।
তবে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক মার্কিন কর্মকর্তা ভিন্ন সুর বাজিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে তাদের হাতে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং এ নিয়ে তাদের কোনো তাড়াহুড়ো নেই। এর আগে চুক্তি স্বাক্ষরের কিছুদিন পরই দুই পক্ষ পুনরায় হামলায় জড়ালে আগের সমঝোতা ভেস্তে যায়। অনুমতি ছাড়া পার হওয়ার অভিযোগে ইরান বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলাও চালিয়েছিল।
পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে ট্রাম্পের কড়া অবস্থানের বিপরীতে ইরানও নিজেদের দাবিতে অনড়। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র শান্তি প্রস্তাবে সম্মত হলেও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা বা তা দেশের বাইরে পাঠানোর মতো পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার নিয়ে তেহরান কোনো ছাড় দেবে না।
এদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ট্রাম্পের শর্তগুলো মেনে চলবে কি না, তা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে সন্দিহান। তাই তিনি তার কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন যে, ইরানের ওপর নতুন করে বোমা হামলা চালানোর সম্ভাবনাই তিনি বেশি দেখছেন। যদিও রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের শুরু হয়। এরপর কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো বারবার ব্যর্থ হয়েছে এবং উভয় পক্ষের পাল্টা হামলায় প্রাণহানির পাশাপাশি ইরানের অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইরান ও তাদের মিত্ররা পাল্টা হামলা চালিয়ে সংঘাতটি পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছে। ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে থাকা ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধের বিস্তৃত প্রভাব সামলাতে সৌদি আরবের মিত্ররাও এখন নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে একজোট হয়েছে। ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুতিরা সৌদি আরবের শহর, জ্বালানি অবকাঠামো ও নৌযান চলাচলকে লক্ষ্যবস্তু করে লাগাতার হামলা চালাচ্ছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেন জোট সম্প্রতি হুতিদের ছোড়া ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল বন্ধ থাকায় উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানির প্রধান বিকল্প পথ লোহিত সাগর দিয়েও পণ্য পরিবহন এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন