সহ-পাইলটের হামলায় গুরুতর আহত হয়েও নিজের জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি বিমানে থাকা অন্যদের রক্ষা করতে শেষ চেষ্টা করেছিলেন ফ্লাইদুবাইয়ের ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। ককপিটের মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায়ও তিনি বুঝতে পারছিলেন বিমানটি দ্রুত নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। তখনই ককপিটের দরজা খোলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইট এফজেড১০৭৩-এ বুধবার এই ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। বিমানে ১৭৪ জন যাত্রীসহ ক্রু সদস্যরা ছিলেন। উড্ডয়নের প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। একপর্যায়ে ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার আহত হন এবং বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারাতে শুরু করে।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার ফুট উচ্চতা হারায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এরও বেশি উচ্চতা হারানোর কথা বলা হয়েছে। পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠলে বিমান থেকে প্রথমে জরুরি সংকেত পাঠানো হয়। পরে ৭৫০০ কোড ব্যবহার করা হয়, যা সাধারণত বিমানে ছিনতাই বা বেআইনি হস্তক্ষেপের পরিস্থিতি বোঝায়।

এই সময় আহত ক্যাপ্টেন মাচ্ছার ককপিটের মেঝেতে পড়ে ছিলেন। তাঁর শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল এবং তিনি নিজেও হামলার শিকার হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু বিমানটি যে বিপজ্জনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে, সেটি তিনি বুঝতে পারছিলেন। ১৭ বছরের উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা থেকে বিমানের অবস্থার পরিবর্তন বুঝতে তাঁর খুব বেশি সময় লাগেনি।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ভিডিও কলে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মাচ্ছার বলেন, তিনি যখন মেঝেতে পড়ে ছিলেন তখন বুঝতে পারেন, তাঁকে কিছু একটা করতেই হবে। ককপিটের দরজা তাঁর কাছেই ছিল। তাই নিজের শেষ শক্তি দিয়ে দরজাটি খোলার চেষ্টা করেন।

দরজা খুলে যাওয়ার পর যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা ককপিটে প্রবেশ করেন। তাঁরা হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এই সময় বিমানে থাকা আরও দুইজন ফ্লাইদুবাই পাইলট, যারা যাত্রী হিসেবে ভ্রমণ করছিলেন, ককপিটের নিয়ন্ত্রণ নিতে সহায়তা করেন। শেষ পর্যন্ত তাঁরা বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করান।

মাচ্ছারের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন তিনি শুধু নিজের জীবন নিয়ে ভাবছিলেন না। বিমানে থাকা অন্য মানুষগুলোর কথাও তাঁর মাথায় ছিল। তিনি বুঝেছিলেন, তিনি যদি কোনোভাবে ককপিটের দরজা খুলতে পারেন, তাহলে অন্যরা ভেতরে ঢুকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারবেন।

ঘটনার পর আহত ক্যাপ্টেনকে প্রথমে তাবুকের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে আবুধাবিতে নেওয়া হয় চিকিৎসার জন্য। ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, তিনি ভালো আছেন এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন।

ঘটনার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন। মাচ্ছারের সাহস, ধৈর্য ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশংসা করেন তিনি। ভারতীয় দূতাবাসের পক্ষ থেকেও পাইলটটির শারীরিক অবস্থার বিষয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে।

ফ্লাইদুবাইয়ের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে ককপিটের একটি গুরুতর সংঘর্ষ বা নিরাপত্তা ঘটনা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে হামলার পেছনে ঠিক কী উদ্দেশ্য ছিল, সেটি তদন্তের বিষয়। হামলাকারী কীভাবে ককপিটে ব্যবহৃত অস্ত্র পেয়েছিল এবং হামলার পরিকল্পনা আগে থেকে করা হয়েছিল কি না, সেসব প্রশ্নেরও উত্তর এখনো তদন্তের মাধ্যমে খোঁজা হচ্ছে। ফ্লাইদুবাই আগাম কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছে।

ঘটনার সময় বিমানটি দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ায় যাত্রীদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে যাত্রী ও ক্রু সদস্যদের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। তাবুকে নিরাপদে অবতরণের পর যাত্রীদের অন্য একটি বিমানে করে তেল আবিবে নেওয়া হয়।

ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের এই অভিজ্ঞতা এখন বিমান নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে একটি বিমানের ককপিটের ভেতরে দুই পাইলটের একজন অন্যজনের ওপর হামলা করলে কীভাবে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, গুরুতর আহত অবস্থায়ও মাচ্ছার ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এরপর যাত্রী, ক্রু এবং বিমানে থাকা অতিরিক্ত পাইলটদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার উদ্দেশ্য ও পুরো ঘটনার কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।