রাজধানীর শাহবাগ ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক উদ্ধার হচ্ছে পরিচয়হীন মানুষের মরদেহ। হাসপাতাল চত্বর, ফুটপাত কিংবা সড়কের পাশ থেকে উদ্ধার হওয়া এসব মানুষের অনেকের পরিচয় মৃত্যুর পরও জানা যাচ্ছে না। শাহবাগ থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে ওই এলাকা থেকে ৭৯টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৪ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, বাকি ৬৫ জন রয়ে গেছেন অজ্ঞাতপরিচয়।

পুলিশের হিসাব বলছে, ২০২৫ সালে একই এলাকা থেকে ৮১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। তখন পরিচয় শনাক্ত হয় মাত্র ১৩ জনের। অর্থাৎ, গত ২১ মাসে শাহবাগ ও আশপাশের এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া ১৬০টি মরদেহের মধ্যে ১৩৩ জনের পরিচয় অজানাই থেকে গেছে।

সাম্প্রতিক সময়েও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর শাহবাগ এলাকায় এক দিনেই তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ২৬ সেপ্টেম্বর একই এলাকা থেকে পাওয়া যায় আরও চারজনের মরদেহ। শুধু শাহবাগ নয়, রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও নিয়মিত উদ্ধার হচ্ছে পরিচয়হীন মানুষের মরদেহ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজধানীর আটটি বিভাগে মোট ২১৪টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮১টি ছিল রমনা বিভাগে, যার বড় অংশ শাহবাগ থানা এলাকার। তেজগাঁও বিভাগে ৫১টি, ওয়ারীতে ২১টি, লালবাগ ও মতিঝিলে ১৭টি করে, মিরপুরে ১২টি, উত্তরায় ৯টি এবং গুলশানে ছয়টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে ৭৬টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে রমনা বিভাগে ৩১টি, মতিঝিলে ১৪টি এবং ওয়ারীতে ১৩টি মরদেহ পাওয়া যায়। এসব পরিসংখ্যান রাজধানীতে পরিচয়হীন মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি সামনে এনেছে।

শাহবাগ এলাকায় এত মরদেহ উদ্ধারের পেছনে কী কারণ

সংশ্লিষ্টদের মতে, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আশপাশে দীর্ঘদিন ধরে অনেক ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষ বসবাস করেন। এ এলাকায় হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থাকায় মানুষের আনাগোনা বেশি। পাশাপাশি বিনা মূল্যে খাবার ও অস্থায়ী আশ্রয়ের সুযোগ থাকায় রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা থেকে অসহায় মানুষ এখানে এসে অবস্থান করেন।

হাইকোর্ট মাজারসহ আশপাশের কয়েকটি স্থানে প্রতিদিন খাবার বিতরণ করা হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আশপাশের খাবারের দোকান এবং অন্যান্য স্থান থেকেও অনেকে খাবার সংগ্রহ করেন। ফলে অসুস্থ, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ও আশ্রয়হীন মানুষের একটি অংশ এ এলাকায় দীর্ঘ সময় কাটান।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব মানুষের অনেকের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ থাকে না। অসুস্থ হলেও নিয়মিত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সীমিত। দীর্ঘদিনের রোগ, অপুষ্টি এবং চিকিৎসার অভাবে কারও শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে। মৃত্যুর পর পরিচয় শনাক্ত করার মতো তথ্য না থাকায় তাদের স্বজনদের খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

ঢাকা মেডিক্যালে পৌনে ছয় বছরে ১ হাজার ৬৯০ মরদেহের ময়নাতদন্ত

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন অ্যান্ড টক্সিকোলজি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত সেখানে ১ হাজার ৬৯০টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে। ২০২১ সালে ২৪৮টি, ২০২২ সালে ২৩০টি, ২০২৩ সালে ২৫০টি, ২০২৪ সালে ৩২৪টি এবং ২০২৫ সালে ৩৮৪টি মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে এই সংখ্যা ছিল ২৫৪।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ময়নাতদন্তের সংখ্যা বেড়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, শীতকালে রাস্তায় বসবাস করা অসুস্থ মানুষের মৃত্যুঝুঁকি বাড়তে পারে। ঠান্ডাজনিত অসুস্থতা ও দীর্ঘদিনের শারীরিক জটিলতা এর অন্যতম কারণ। পুলিশের পর্যবেক্ষণে মৃত ব্যক্তিদের অনেকের বয়স ৪০ বছরের বেশি এবং কারও কারও মাদকাসক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার তথ্য রয়েছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন অ্যান্ড টক্সিকোলজি বিভাগের প্রধান ডা. মমতাজ আরা জানান, বিভিন্ন স্থানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মারা যাওয়া অনেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে সেপটিক শকের লক্ষণ পাওয়া যায়। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একে একে অকার্যকর হয়ে পড়লে এ ধরনের রোগীর মৃত্যু হতে পারে।

পরিচয় শনাক্তে যেসব পদ্ধতি ব্যবহার করে পুলিশ

অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ প্রথমে আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করে। পরে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সহায়তায় জাতীয় তথ্যভান্ডারের সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়।

তবে মৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলে কিংবা আঙুলের ছাপের তথ্য কোনো ডেটাবেজে না পাওয়া গেলে শনাক্তকরণ কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় পর মরদেহ উদ্ধার হলে পচনের কারণে আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করাও সম্ভব নাও হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন থানায় তথ্য পাঠানো এবং ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তে সহায়তা চাওয়া হয়। দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পরিচয় না মিললে মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী দাঁত ও হাড়ের নমুনাও সংরক্ষণ করা হয়।

ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার জাহিদুল ইসলাম বলেন, অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে উদ্ধার হওয়া অনেক মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা যায় না। পরিচয় না মিললে আইনি প্রক্রিয়া শেষে সেগুলো বেওয়ারিশ মরদেহ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তিন বছর নয় মাসে দাফন ২ হাজার ১৬৪ মরদেহ

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে ২ হাজার ১৬৪টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ৪৯০টি, ২০২৪ সালে ৫৭০টি এবং ২০২৫ সালে ৬৪৪টি মরদেহ দাফন করা হয়। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দাফন করা হয়েছে আরও ৪৬০টি মরদেহ।

পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মরদেহ গ্রহণের পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংস্থাটি রায়েরবাজার ও জুরাইন কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করে। দাফন করা মরদেহগুলোর তথ্য এবং কবরের অবস্থানসংক্রান্ত তালিকাও সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে কোনো স্বজনের সন্ধান পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কবর শনাক্ত করতে সহায়তা করা হয়।

শাহবাগে পরিচয়হীন মানুষের মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা এবং রাজধানীতে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষের মৃত্যুর পর পরিচয় নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। পরিচয় শনাক্তের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি অসুস্থ ও আশ্রয়হীন মানুষের জন্য চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তার সুযোগ বাড়ানোও এ সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ দিক।