সাভারের আলোচিত রানা প্লাজা নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ভবনটির মালিক সোহেল রানাসহ আট আসামির বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক শুনানি আবারও পিছিয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট বিচারক ছুটিতে থাকায় নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ২৮ অক্টোবর মামলাটির যুক্তিতর্ক উপস্থাপন হবে।
ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতে মামলাটির বিচার চলছে। নির্ধারিত দিনে বিভাগীয় স্পেশাল জজ বি.এম. তারিকুল কবীর ছুটিতে থাকায় ভারপ্রাপ্ত বিচারক রফিকুল ইসলাম পরবর্তী তারিখ ঘোষণা করেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী আরিফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে পৌঁছেছিল। গত ১৬ আগস্ট রায় ঘোষণার দিন ঠিক করা হলেও রায় প্রস্তুত না হওয়ায় তা পিছিয়ে ১ সেপ্টেম্বর করা হয়। পরে ১ সেপ্টেম্বর রায় না দিয়ে আদালত স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মামলাটি আবার যুক্তিতর্কের পর্যায়ে ফিরিয়ে নেন। ফলে নতুন করে আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়।
দুর্নীতির এ মামলায় মোট আটজন আসামি বিচারাধীন রয়েছেন। সোহেল রানা ছাড়াও আসামিদের তালিকায় রয়েছেন সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহ, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়, নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, সাবেক উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, সাবেক টাউন প্ল্যানার ফারজানা ইসলাম এবং লাইসেন্স পরিদর্শক মো. আব্দুল মোত্তালিব।
আসামিদের মধ্যে সোহেল রানা এই মামলায় জামিনে থাকলেও রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন। মঙ্গলবার তাকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। অন্যদিকে মাহবুবুর রহমান ও ফারজানা ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে পলাতক। বাকি আসামিরা জামিনে রয়েছেন।
মামলার বিচার চলাকালে সোহেল রানার বাবা আবদুল খালেক ও মা মর্জিনা খাতুন বেগম মারা যান। পরে আদালতের আদেশে তাদের এ মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
রানা প্লাজা ধসের ঘটনা বাংলাদেশের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা হিসেবে পরিচিত। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাছে ১০ তলা ভবনটি ধসে পড়ে। ভবনের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় কর্মরত প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক তখন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন। কয়েক দিনের উদ্ধার অভিযানে ১ হাজার ১৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং জীবিত উদ্ধার করা হয় ২ হাজার ৪৩৮ জনকে। আহত ও পঙ্গুত্বের শিকার হন প্রায় দুই হাজার শ্রমিক।
দুর্ঘটনার পাঁচ দিন পর ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় বেনাপোল সীমান্ত এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরে ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০১৪ সালের ১৫ জুন সাভার থানায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
প্রথম দিকে ভবনটি সোহেল রানার বাবার নামে থাকায় মামলায় তাকে আসামি করা হয়নি। তবে তদন্তে ভবন নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় সোহেল রানার সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর তাকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তী তদন্তে আসামির সংখ্যা ১৮ জনে উন্নীত হয়। পরে আটজনকে অব্যাহতি দিয়ে ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার এগিয়ে নেওয়া হয়।
দুদকের তদন্তে উঠে আসে, মূল অনুমোদন ছিল ছয়তলা ‘রানা প্লাজা’ শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য। পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত চারতলা নির্মাণের অনুমোদন নেওয়া হলেও আগের নথির তথ্য গোপন করে নতুন নথির মাধ্যমে ১০ তলা ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়। ভবনটি শপিং কমপ্লেক্স হিসেবে নির্মাণের কথা থাকলেও পরে সেখানে একাধিক পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়।
২০১৭ সালের ২১ মে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার বিচার শুরু হয়। বিচারপর্বে ২০ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৯ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। বর্তমানে যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর মামলাটি রায়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও নতুন তারিখ নির্ধারণ হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া আরও কিছুটা পিছিয়েছে।
সোহেল রানার বিরুদ্ধে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় হত্যা মামলা ছাড়াও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে আরেকটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন