নেপালের হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ তুষারধসের ঘটনায় হিমলুং হিমালের শিবির থেকে অন্তত ১৪ জন নেপালি নিখোঁজ হয়েছেন। মানাং জেলার নার ফু এলাকায় ৭ হাজার ১২৬ মিটার উচ্চতার এই পর্বতে তুষারধসের পর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিখোঁজদের মধ্যে শেরপা, পর্বতারোহণ দলের সহায়ক কর্মী এবং রান্নার কাজে যুক্ত ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

রোববার সকালে প্রথমে আটজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না বলে জানানো হয়। পরে পরিস্থিতি যাচাই ও যোগাযোগের চেষ্টা করতে গিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা ১৪ জনে দাঁড়ায়। অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে নেপালি কর্মীদের একটি দল বিদেশি পর্বতারোহীদের আগেই হিমলুংয়ে পাঠানো হয়েছিল। তাদের দায়িত্ব ছিল শিবির প্রস্তুত করা, পর্বতারোহণের পথ পরিষ্কার করা, প্রয়োজনীয় দড়ি স্থাপন এবং অভিযানের অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করা।

হিমলুংয়ে থাকা এক শেরপা স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের জন্য যোগাযোগ করেন। তখন আটজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে আবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর নিখোঁজদের সংখ্যা আরও বাড়ার তথ্য পাওয়া যায়। বর্তমান প্রতিবেদনে নিখোঁজ ১৪ জনই নেপালি বলে জানানো হয়েছে। বিদেশি পর্বতারোহীরা তখনো ওই এলাকায় পৌঁছাননি। তারা আরও পাঁচ থেকে ছয় দিনের মধ্যে সেখানে যাওয়ার কথা ছিল।

তুষারধসের পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আবহাওয়ার কারণে তা বড় বাধার মুখে পড়ে। কাঠমান্ডু ও পোখারায় বেসরকারি হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নেপালের সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার ব্যবহারের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু পাহাড়ি এলাকায় প্রতিকূল আবহাওয়া থাকায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারগুলো দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি।

স্থলপথেও উদ্ধারকারী দলের জন্য পরিস্থিতি সহজ নয়। দুর্গম পাহাড়ি অবস্থান, তুষারপাত এবং যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সময় লাগছে। ফলে আবহাওয়া কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে উদ্ধারকারীদের। নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে।

হিমলুং হিমাল নেপালের মানাং জেলার নার ফু অঞ্চলে অবস্থিত। তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় এলাকাটি ভৌগোলিকভাবে বেশ দুর্গম। পর্বতারোহণের জন্য সেখানে যাওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু প্রশাসনিক অনুমতির প্রয়োজন হয়। এ কারণে কোনো দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধারকারী দল পৌঁছে দেওয়া অন্য অনেক পর্বতের তুলনায় বেশি কঠিন হয়ে পড়ে।

তুষারধসের সময় নিখোঁজ ব্যক্তিরা মূলত পর্বতারোহণ অভিযানের প্রস্তুতিমূলক কাজে নিয়োজিত ছিলেন। বিদেশি পর্বতারোহীরা পৌঁছানোর আগে তারা শিবির প্রস্তুত ও পথ ব্যবস্থাপনার কাজ করছিলেন। বিভিন্ন অভিযানের ক্ষেত্রে স্থানীয় শেরপা ও সহায়ক কর্মীরা এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতির দায়িত্ব পালন করেন।

এদিকে তুষারধসের ঘটনার সময় নেপালের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি ও তুষারপাত চলছিল। বৈরী আবহাওয়ার কারণে দেশটির কয়েকটি পর্বতারোহণ অভিযানেও প্রভাব পড়েছে। আবহাওয়ার অবনতি হওয়ায় পর্বতারোহী ও ট্রেকারদের উচ্চাঞ্চলে চলাচল সীমিত বা স্থগিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

হিমলুংয়ের ঘটনাটি সামনে আসার পর উদ্ধার তৎপরতার জন্য অভিজ্ঞ পর্বতারোহী ও গাইডদের প্রস্তুত রাখা হয়। নেপালের জাতীয় মাউন্টেন গাইড সংগঠনও উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য গাইডদের প্রস্তুত রেখেছিল। পরে উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা হিমলুংয়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

তুষারধসের পর নিখোঁজদের অবস্থান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় শুরুতে ঠিক কতজন নিখোঁজ হয়েছেন, তা নিশ্চিত করতেও সময় লেগেছে। পরে সংশ্লিষ্ট অভিযানের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিখোঁজের সংখ্যা বাড়ার তথ্য পাওয়া যায়। একই সময়ে কিছু নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের খবরও এসেছে, ফলে পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।

হিমলুং হিমালের এই দুর্ঘটনা আবারও উচ্চ পর্বত এলাকায় আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন এবং তুষারধসের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। বিশেষ করে শরৎকালীন পর্বতারোহণ মৌসুম শুরুর আগে শিবির প্রস্তুত করতে যাওয়া কর্মীদের জন্য এমন পরিস্থিতি বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এখন উদ্ধারকারী দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য নিখোঁজ নেপালিদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা। তবে পাহাড়ে অব্যাহত তুষারপাত, খারাপ আবহাওয়া এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান উদ্ধার অভিযানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে এলে আকাশপথে উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।