ফুলের পাপড়ির বাঁক, পাতার গায়ে আলোর স্পর্শ কিংবা রঙের সামান্য পরিবর্তন। অভিউল মারুফের ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’-এ এমন ছোট বিষয়গুলোই ছবির কেন্দ্রে আসে। সিলেটে তৈরি এই আলোকচিত্র সিরিজে পরিচিত প্রকৃতিকে ধীরে, কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন তিনি। সেই কাজ প্রকাশিত হয়েছে দ্য আই অব ফটোগ্রাফি, কোলাতেরাল, বায়রন ও স্পেকটাকুলামের মতো আন্তর্জাতিক প্রকাশনায়।

হবিগঞ্জে জন্ম নেওয়া অভিউল বর্তমানে সিলেটভিত্তিক আলোকচিত্রী। আর্থ ডট অর্গে প্রকাশিত তাঁর পরিচিতি অনুযায়ী, ২০২২ সালে তিনি আলোকচিত্রচর্চা শুরু করেন। প্রকৃতি তাঁর কাজের প্রধান বিষয় হয়ে উঠলেও রাতের দৃশ্য, দীর্ঘ এক্সপোজার ও বিমূর্ত ছবি নিয়েও পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন।

অন্ধকারে ছবি দেখে শুরু কৌতূহল

ক্যামেরার প্রতি তাঁর আগ্রহের পেছনে রয়েছে ছোটবেলার একটি অভিজ্ঞতা। গ্ল্যাজআর্টে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে অভিউল জানিয়েছেন, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক রাতে মামার সঙ্গে ছবি তুলতে বেরিয়েছিলেন। অন্ধকারে কীভাবে ছবি উঠবে, তা নিয়ে তাঁর মনে প্রশ্ন ছিল।

মামা ফোনের ম্যানুয়াল মোডে শাটার স্পিড ও আইএসও ঠিক করে ছবি তুললেন। পর্দায় দেখা গেল, অন্ধকার দৃশ্যও আলোকিত হয়ে উঠেছে। ক্যামেরা যে সময় নিয়ে আলো সংগ্রহ করতে পারে, সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে দীর্ঘ এক্সপোজারের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। পরে রাতের শহরে চলমান আলোর রেখা নিয়ে তাঁর ‘মিডনাইট ম্যাজিশিয়ান’ প্রকল্পেও সেই অনুসন্ধান এগিয়েছে।

আলাদা ছবি থেকে একটি সিরিজ

‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’-এর শুরু নিজের তোলা ছবিগুলো ফিরে দেখা থেকে। রূপালী বাংলাদেশে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে অভিউল জানিয়েছেন, কয়েকটি ছবির মধ্যে একই ধরনের শান্ত অনুভূতি খুঁজে পান তিনি। সেই মিল থেকেই ছবিগুলো একটি সিরিজে সাজানোর ভাবনা আসে।

নামের মধ্যেও সেই অনুভূতির ইঙ্গিত রয়েছে। ফুল ও উদ্ভিদের উপস্থিতিকে আলো, গঠন ও স্থিরতার মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি। পাপড়ির রেখা কিংবা পাতার সূক্ষ্ম বুনন এখানে মনোযোগের বিষয়।

স্পেকটাকুলামের ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ফিচারে তাঁর কাজের এই ধীর প্রক্রিয়ার কথা উঠে এসেছে। বিষয়কে পর্যবেক্ষণ করতে সময় দেন অভিউল; ফুল ও পাতার আকৃতি, রং এবং আলো অনুসারে ছবির বিন্যাস তৈরি করেন। দর্শকের কাছেও ছবিগুলো একই মনোযোগ চায়।

মোবাইলের ক্যামেরায় আলো নিয়ে পরীক্ষা

ওয়ার্থওয়াইল ম্যাগাজিনের সাক্ষাৎকারে অভিউল জানিয়েছেন, ছবি তুলতে তিনি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। বিভিন্ন সময়ে স্যামসাং, রেডমি ও সিম্ফনির ফোনে কাজ করেছেন। ম্যানুয়াল মোডে দৃশ্যের আলো দেখে এক্সপোজার ঠিক করেন।

সেই সাক্ষাৎকারে প্রাকৃতিক আলোয় ছবি তোলা এবং স্ন্যাপসিডে প্রয়োজনমতো উজ্জ্বলতা ও রঙের মাত্রা বদলানোর কথা বলেছেন তিনি। তাঁর বর্ণনায়, ছবির আবহ তৈরিতে দৃশ্যটি পর্যবেক্ষণ করা ও আলো বুঝে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’-এর সব ছবিতে দীর্ঘ এক্সপোজার ব্যবহার করা হয়নি। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি জানিয়েছেন, এই কৌশল তাঁর আলো দেখার ধরনকে প্রভাবিত করেছে। সিরিজে নরম আলো, ছায়া ও সূক্ষ্ম বিবরণের মধ্য দিয়েও সেই দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে।

বিদেশি প্রকাশনায় কাজের পাঠ

কোলাতেরালের ‘The Magic of Botany Through Oviul Maruf’s Lens’ নিবন্ধে সিলেটে তৈরি প্রকল্পটির অন্তরঙ্গ আবহ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে ফুল ও উদ্ভিদের উপস্থিতি, স্থিরতা এবং পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিচিত পরিবেশে কিছুক্ষণ থেমে তাকানোর অনুভূতি ছবিগুলো কীভাবে তৈরি করে, সেটিও আলোচনায় এসেছে।

দ্য আই অব ফটোগ্রাফির অভিউল মারুফকে নিয়ে প্রকাশিত পাতায় ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’-এর পরিচিতি রয়েছে। বায়রন ম্যাগাজিন ‘The Quiet Poetry of Flowers’ শিরোনামে তাঁর ছবি ও প্রকল্পের বক্তব্য প্রকাশ করেছে। স্পেকটাকুলামেও সিরিজের ছবির সঙ্গে তাঁর শিল্পভাবনা উঠে এসেছে। পরিবেশবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম আর্থ ডট অর্গের আলোকচিত্রী বিভাগে রয়েছে তাঁর পৃথক পরিচিতি।

এই প্রকাশনাগুলোতে কাজটি পৌঁছানোয় আন্তর্জাতিক পাঠকের সামনে তাঁর আলোকচিত্র দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকাশিত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, সিরিজটির আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে সাধারণ উদ্ভিদকে মনোযোগ দিয়ে দেখার পদ্ধতি।

প্রকৃতির ছবি থেকে গ্রামের শৈশব

ফুল ও রাতের আলোর বাইরেও নতুন বিষয় নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে অভিউলের। ওয়ার্থওয়াইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের গ্রামের শিশুদের শৈশব নিয়ে একটি আলোকচিত্র প্রকল্পের স্বপ্নের কথা জানিয়েছেন তিনি। পানিতে খেলা, ক্রিকেট-ফুটবল এবং বেড়ে ওঠার মুহূর্তগুলো সাদাকালো ছবিতে তুলে ধরতে চান।

‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ সেই পথচলার একটি অধ্যায়। এই সিরিজের পরিচিত ফুল ও পাতা মনে করিয়ে দেয়, ছবির বিষয় আমাদের আশপাশেই থাকতে পারে। তাকে খুঁজে পেতে দরকার সময় নিয়ে তাকানো।