একসময় ক্রীড়া পোশাক ও জুতার বাজারে যে ব্র্যান্ডকে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হতো, সেই নাইকি এখন কঠিন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিক্রি কমেছে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাজারে গ্রাহকের চাহিদা দুর্বল হয়েছে এবং নতুন প্রজন্মের ক্রীড়া ব্র্যান্ডগুলো বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।

বিশ্বের অন্যতম বড় স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ডটি এখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে রয়েছেন এলিয়ট হিল, যিনি দীর্ঘ সময় পর অবসর থেকে ফিরে নাইকির দায়িত্ব নেন। তাঁর নেতৃত্বে ‘স্পোর্ট অফেন্স’ নামের পুনর্গঠন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নাইকি বলছে, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে পারফরম্যান্স পণ্যে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। তবে স্পোর্টসওয়্যার, জর্ডান ব্র্যান্ড এবং চীনের বাজারে এখনো অনেক কাজ বাকি।

নাইকির সমস্যার পেছনে কয়েকটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ক্রীড়া খাতের বিশ্লেষকেরা। এর মধ্যে অন্যতম ছিল খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে সরাসরি গ্রাহকের কাছে অনলাইনে পণ্য বিক্রির দিকে বেশি ঝুঁকে পড়া। মহামারির সময় অনলাইন বিক্রি বাড়লেও পরবর্তী সময়ে গ্রাহকের চাহিদা দুর্বল হওয়ার সঙ্গে এই কৌশলের সীমাবদ্ধতাও সামনে আসে।

আরেকটি সমস্যা ছিল পণ্যের উদ্ভাবনে গতি কমে যাওয়া। বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল ব্যবসা সম্প্রসারণে বেশি মনোযোগ দিতে গিয়ে নতুন ও আকর্ষণীয় পণ্য তৈরির ক্ষেত্রে নাইকির বিনিয়োগের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছিল। একই সময়ে অন ও হোকার মতো নতুন প্রজন্মের ব্র্যান্ডগুলো বাজারের পরিবর্তিত রুচি ও প্রবণতার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেয়।

নাইকির জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্র্যান্ডটির অতীত সাফল্যের বড় অংশ এসেছে উদ্ভাবনী পণ্য এবং তারকা ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব থেকে। আশির দশকে মাইকেল জর্ডানের সঙ্গে চুক্তি ছিল সেই কৌশলের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। জর্ডানকে ঘিরে তৈরি করা এয়ার জর্ডান পরবর্তীতে নিজেই একটি বিশাল ব্র্যান্ডে পরিণত হয়।

এরপর টাইগার উডস, সেরেনা উইলিয়ামস ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো তারকারাও নাইকির বিশ্বব্যাপী পরিচিতি বাড়াতে ভূমিকা রাখেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পুরোনো তারকা-নির্ভর সাফল্য ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের ক্রীড়া তারকাদের ঘিরে একই ধরনের প্রভাব তৈরি করা নাইকির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

এই জায়গাতেই সাম্প্রতিক সময়ে কিলিয়ান এমবাপ্পের বিদায় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। নয় বছর বয়সে নাইকির সঙ্গে সম্পর্ক শুরু করা ফরাসি এই ফুটবল তারকা দুই দশকের অংশীদারত্ব শেষ করে সুইস ব্র্যান্ড অনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এমবাপ্পের এই পরিবর্তন নাইকির তারকা-নির্ভর বিপণন কৌশল নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

নাইকির বর্তমান অবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চীনের বাজার। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ফলাফলে বৃহত্তর চীন অঞ্চলে দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৬ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে নাইকি ব্র্যান্ডের আয় কমার পেছনে বৃহত্তর চীন ও ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের পতন ভূমিকা রেখেছিল। একই সময়ে নাইকি ডাইরেক্ট ব্যবসার আয়ও কমেছে।

২০২৬ অর্থবছরে নাইকির মোট আয় ছিল ৪৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রতিবেদিত হিসাবে প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। তবে মুদ্রা-নিরপেক্ষ হিসাবে আয় ২ শতাংশ কমে যায়। নাইকি ডাইরেক্টের আয় কমেছে ৬ শতাংশ এবং নাইকি ব্র্যান্ড ডিজিটাল ব্যবসায়ও পতন দেখা গেছে।

জর্ডান ব্র্যান্ডও চাপের মধ্যে রয়েছে। নাইকির বর্তমান নেতৃত্ব জানিয়েছে, এই ব্র্যান্ডের পণ্য অতিরিক্ত পরিমাণে বাজারে সরবরাহ করা হয়েছিল। ফলে এখন পণ্যের পরিমাণ ও বাজারে ছাড়ার ঘনত্ব কমানোর দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।

তবে নাইকির সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে শুধু পতনের গল্প হিসেবেও দেখা হচ্ছে না। ২০২৬ সালের শেষ প্রান্তিকের পর প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, পারফরম্যান্স পণ্যে অগ্রগতি হচ্ছে এবং পাইকারি বিক্রিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে নাইকি ‘স্পোর্ট অফেন্স’ পরিকল্পনার গতি বাড়ানোর পাশাপাশি ‘পেস’ নামে নতুন অপারেটিং মডেল চালুর কথা জানিয়েছে।

নতুন পরিকল্পনায় প্রতিষ্ঠানটি আরও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, স্থানীয়ভাবে ক্রীড়াবিদ ও ভোক্তাদের প্রয়োজন বোঝা এবং পণ্য উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যবসাকে আরও দক্ষ করার লক্ষ্যে কর্মীসংখ্যা কমানোর মতো সাংগঠনিক পরিবর্তনের কথাও জানিয়েছে নাইকি। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত সিদ্ধান্তগুলো ২০২৭ সাল ও পরবর্তী সময়ে কার্যকর হওয়ার কথা।

অর্থাৎ নাইকির সামনে এখন একসঙ্গে দুটি কাজ। একদিকে অতীতের বিশাল ব্র্যান্ড শক্তি ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে এমন পণ্য ও বিপণন কৌশল তৈরি করতে হবে যা বর্তমান প্রজন্মের ভোক্তাদের কাছে নতুন করে আকর্ষণ তৈরি করবে। নাইকির নেতৃত্বও স্বীকার করছে, পুনর্গঠনের কাজ এখনো শেষ হয়নি।

একসময় যে প্রতিষ্ঠান নতুন পণ্য, তারকা খেলোয়াড় ও সাহসী বিপণনের মাধ্যমে পুরো ক্রীড়া বাজারের গতিপথ বদলে দিয়েছিল, সেই নাইকিকে এখন নিজের সেই গতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে পণ্য উদ্ভাবন, চীনের বাজার, জর্ডান ব্র্যান্ড এবং নতুন প্রজন্মের ক্রীড়া তারকাদের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা শক্তিশালী করা যায়, তার ওপর এই পুনর্গঠনের ফল অনেকটাই নির্ভর করবে।