কেশবপুরের মৃৎশিল্প আধুনিক প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়াম সামগ্রীর দাপটে চাহিদা হারালেও এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। যশোরের কেশবপুরের স্থানীয় বাজারে হাঁড়ি, পাতিল, প্লেট, মগ, ফুলদানি, টব ও জগসহ নানা ধরনের মাটির পণ্য বিক্রি হচ্ছে। তবে কাঁচামালের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে প্রাচীন এই লোকশিল্প দিন দিন কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ছে।
স্থানীয় বাজারের প্রবীণ মৃৎশিল্পী ও ব্যবসায়ী ব্রু দাস পাল জানান, প্রায় ৮০ বছর ধরে তিনি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে তার দোকানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০০ ধরনের মাটির তৈজসপত্র পাওয়া যায়। এসব পণ্যের মধ্যে ১০ টাকার পয়সার ব্যাংক থেকে শুরু করে ২৫০ টাকা দামের বিশেষ পানি রাখার জগও রয়েছে। দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য ঝিলে সরা তুলনামূলক বেশি বিক্রি হয়।
তিনি জানান, বেশিরভাগ মাটির পণ্য যশোরের দায়তলা থেকে পাইকারি দরে সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবেও কিছু পণ্য পাওয়া যায়। সব ধরনের খরচ বাদ দিয়ে দিনে গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লাভ হয়। এই আয় দিয়েই কোনোরকমে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। ফলে কেশবপুরের মৃৎশিল্প শুধু একটি ঐতিহ্য নয়, বহু পরিবারের জীবিকার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, মাটির পণ্য তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপযুক্ত দোআঁশ ও এঁটেল মাটি এখন সহজে পাওয়া যায় না। দূরবর্তী এলাকা থেকে বেশি দামে মাটি কিনে আনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মাটির তৈরি পণ্যের দামও বাড়ছে। আবার বর্ষাকালে রোদের অভাবে মাটির পণ্য শুকানো কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ এই সময় নির্দিষ্ট কিছু মাটির পাত্রের চাহিদা বেশি থাকে।
কেশবপুরে বর্তমানে আলতাপোল পালপাড়া ও ব্রহ্মকাটি গ্রামের পাল ও কুমার সম্প্রদায়ের মানুষ বংশপরম্পরায় এই পেশা ধরে রেখেছেন। তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মৃৎশিল্পের প্রতি আগ্রহ কমছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী রতন পাল বলেন, প্লাস্টিকের পণ্য তুলনামূলক সস্তা ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় মানুষ মাটির পাত্রের পরিবর্তে এসব সামগ্রীর দিকে বেশি ঝুঁকছেন। পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি সহায়তার অভাবও রয়েছে।
তবে মাটির পণ্যের প্রতি এখনো আগ্রহ রয়েছে বলে জানান ক্রেতারা। ডুমুরিয়া থেকে কেশবপুর বাজারে আসা হাবিবুল্লাহ বলেন, নিত্যপ্রয়োজনের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিকতার কারণে তিনি মাটির প্লেট ও মগ কিনেছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, কেশবপুরের মৃৎশিল্প বাঁচাতে সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ বাড়ানো না হলে সময়ের সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন