বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের মতো প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পদের কোনো কমতি নেই বাংলাদেশে। সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বন, নদী, হাওর, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, সেই সম্ভাবনার তুলনায় বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা এখনো কম। ভিসা জটিলতা, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, মানি এক্সচেঞ্জের সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণার ঘাটতি—সব মিলিয়ে পিছিয়ে রয়েছে দেশের পর্যটন খাত।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে বিদেশি পর্যটক এসেছেন ৫ লাখ ৮৫ হাজার। এর বিপরীতে একই সময়ে ৬ লাখ ৯৪ হাজার বাংলাদেশি বিদেশে ভ্রমণ করেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত বিদেশে গেছেন আরও ৪ লাখ ৮১ হাজার মানুষ। অর্থাৎ বিদেশে বাংলাদেশিদের ভ্রমণ বাড়লেও বিপরীত দিক থেকে পর্যটক টানার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত গতি দেখা যাচ্ছে না। ২০২৪ সালে বিদেশি পর্যটক এসেছিলেন ৬ লাখ ৩৩ হাজার, ২০২৩ সালে ৬ লাখ ৫৫ হাজার এবং ২০২২ সালে ৫ লাখ ২৯ হাজার। এই পরিসংখ্যান পর্যটন খাতের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জটি স্পষ্ট করে।
আন্তর্জাতিক পর্যটন থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৪৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার আয় করেছিল। ২০২৪ সালে সেই আয় কমে দাঁড়ায় প্রায় ৪৪ কোটি ডলারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের পর্যটন আকর্ষণ থাকলেও সেগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারছে না বাংলাদেশ। সহজ ভিসা ব্যবস্থা, অনলাইন বুকিং, নির্ভরযোগ্য পরিবহন, মানসম্মত আবাসন, প্রশিক্ষিত গাইড এবং পর্যটকবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের পর্যটনকে নতুনভাবে ব্র্যান্ডিং করার প্রয়োজন রয়েছে।
দেশের জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যগুলোর মধ্যেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। কক্সবাজারের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, কুয়াকাটার সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি সৌন্দর্য কিংবা নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভিন্নধর্মী জীবনযাপন—সবই বিদেশি ভ্রমণকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। কিন্তু শুধু আকর্ষণ থাকলেই পর্যটক আসে না; প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ, সহজ যোগাযোগ, তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনসেবা। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বাংলাদেশের ‘প্রডাক্ট’ আছে, কিন্তু সেটিকে বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়ার মতো ব্র্যান্ডিং এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশিদের বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতা বাড়ছে। নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা থেকে শুরু করে উন্নত বিভিন্ন দেশে ছুটছেন দেশের ভ্রমণপিপাসুরা। ফলে দেশের পর্যটন খাতে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের সঙ্গে বহির্গমনের ব্যবধান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। পর্যটনকে শুধু বিনোদনের খাত হিসেবে না দেখে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও পর্যটন খাতের অর্থনৈতিক অবদান বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ খাতের প্রকৃত অবদান নিরূপণে ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিশ্ব পর্যটন দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’। তাই এখন সময় শুধু দিবসকেন্দ্রিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব উন্নয়নের দিকে এগোনোর। অনলাইন ভিসা, ডিজিটাল পেমেন্ট, পর্যটন তথ্যের বহুভাষিক প্ল্যাটফর্ম, স্মার্ট বুকিং ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধারাবাহিক প্রচারণা চালানো গেলে বাংলাদেশকে নতুনভাবে তুলে ধরা সম্ভব। দেশের পর্যটন স্পটগুলোতে উন্নত যোগাযোগ, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বিদেশি পর্যটক বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এবং দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন