তাপসী পান্নু বলিউডের এমন একজন অভিনেত্রী, যিনি ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। ‘পিঙ্ক’, ‘থাপ্পড়’, ‘মুল্ক’ থেকে ‘হাসিন দিলরুবা’ বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন তিনি। তবে এই অবস্থানে পৌঁছানোর পথটা মোটেও সহজ ছিল না। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তাঁকে এমন কিছু পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, যেগুলো পরে ফিরে তাকালে তাঁর কাছে বেশ অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ একটি ঘটনা হলো, একটি সিনেমায় অভিনয়ের জন্য সবকিছু ঠিক হয়ে যাওয়ার পরও তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। আর কারণ হিসেবে তাঁকে জানানো হয়েছিল, সিনেমার নায়কের স্ত্রী তাঁকে পছন্দ করতেন না। তাপসী পরে জানিয়েছেন, তখন বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি প্রশ্ন করার সুযোগও তাঁর ছিল না। নতুন অভিনেত্রী হিসেবে কাজ পাওয়াটাই যেখানে বড় বিষয়, সেখানে এমন সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ছাড়া অনেক সময় অন্য পথও থাকে না।
তাপসী পান্নু ২০২০ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সিনেমায় কাজ করার বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল এবং তিনি নিজের সময়ও দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে জানানো হয়, নায়কের স্ত্রী তাঁকে ছবিতে দেখতে চাননি। কারও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের কারণে একজন অভিনেত্রীকে কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা তাপসীর কাছে তখন অদ্ভুত লাগলেও ক্যারিয়ারের শুরুর সময়ে তিনি বিষয়টিকে সেভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেননি। সময়ের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা বাড়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় সব সিদ্ধান্ত সব সময় শুধু অভিনয় বা চরিত্রের প্রয়োজনের ভিত্তিতে নেওয়া হয় না। কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ক্ষমতার সমীকরণ কিংবা তারকার প্রভাবও সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সিনেমা বা নায়কের নাম তাপসী প্রকাশ করেননি।
এমন অভিজ্ঞতা অবশ্য তাপসীর জন্য একেবারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে কখনো তাঁকে বলা হয়েছিল, তিনি যথেষ্ট আকর্ষণীয় নন। আবার কোনো সিনেমায় কাজের জন্য সম্মতি দেওয়ার পর শেষ মুহূর্তে তাঁর চরিত্র বা দৃশ্য বদলে ফেলা হয়েছে। একটি সিনেমায় নিজের প্রবেশদৃশ্য নিয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। সেই দৃশ্যটি পছন্দ হওয়ায় তিনি ছবিটিতে কাজ করতে আগ্রহী হয়েছিলেন। কিন্তু পরে নায়কের চরিত্রকে বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে দৃশ্যটির পরিবর্তন করা হয়। তাপসীর বর্ণনা অনুযায়ী, নায়ক তাঁর প্রবেশদৃশ্যের সঙ্গে নিজের দৃশ্যের গুরুত্বের তুলনা করেছিলেন। ফলে শেষ পর্যন্ত তাঁর পছন্দের অংশটিও আগের মতো রাখা হয়নি। এই ধরনের অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝতে সাহায্য করে, একজন অভিনেত্রীর চরিত্রকে কখনো কখনো কীভাবে তারকার উপস্থিতির তুলনায় কম গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
ডাবিং নিয়েও তাপসীর অভিজ্ঞতা ছিল বেশ অস্বাভাবিক। একটি সিনেমায় তাঁর বলা একটি সংলাপ নায়কের পছন্দ হয়নি বলে তাঁকে জানানো হয়েছিল। সংলাপটি পরিবর্তন করার জন্য বলা হলেও তাপসী তাতে রাজি হননি। পরে তাঁর অমতেই অন্য একজন ডাবিং শিল্পীর কণ্ঠে ওই সংলাপ রেকর্ড করা হয়। সিনেমাটি মুক্তির পর তাপসী জানতে পারেন, পুরো ছবিতে তাঁর নিজের কণ্ঠ থাকলেও একটি নির্দিষ্ট সংলাপ অন্য একজনের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্টে দেওয়া আরেক কথোপকথনে তিনি জানান, ওই দৃশ্যে তাঁকে নায়ককে ‘গেট টু হেল’ বলতে হয়েছিল। ক্লোজ শট হওয়ায় সংলাপটি দৃশ্যটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ডাবিংয়ের সময় পরিচালক তাঁকে সংলাপ বদলাতে বললে কারণ জানতে চান তিনি। পরে জানতে পারেন, নায়ক ওই সংলাপ পছন্দ করেননি। তাপসী সংলাপ পরিবর্তনে রাজি না হয়ে প্রয়োজনে সেটি মিউট করার কথা বলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য অন্য কণ্ঠ ব্যবহার করা হয়।
পারিশ্রমিক নিয়েও ক্যারিয়ারের শুরুতে অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন তাপসী পান্নু। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো নায়কের আগের সিনেমা প্রত্যাশামতো ব্যবসা না করলে তার প্রভাব কখনো কখনো সহশিল্পীর পারিশ্রমিকের ওপরও পড়ত। একবার তাঁকে বলা হয়েছিল, নায়কের আগের ছবি ভালো ব্যবসা করেনি, তাই বাজেট কমানোর জন্য তাঁর পারিশ্রমিক কমাতে হবে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নায়কের প্রবেশদৃশ্যের চেয়ে তাঁর চরিত্রের দৃশ্য বেশি নজর কাড়তে পারে এমন আশঙ্কাতেও আপত্তি এসেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সেটে নারী ও পুরুষ শিল্পীদের জন্য সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য নিয়েও কথা বলেছেন এই অভিনেত্রী। তাঁর মতে, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে হোটেল, গাড়ি কিংবা শুটিংয়ে উপস্থিত হওয়ার সময়ের ক্ষেত্রেও নারী অভিনেত্রীদের সঙ্গে ভিন্ন আচরণের অভিজ্ঞতা হয়েছে। তখন এসবকে স্বাভাবিক মনে হলেও পরে অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিষয়গুলোর ভিন্ন দিক বুঝতে শুরু করেন।
তবে এসব বাধা তাপসী পান্নুর ক্যারিয়ার থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং সময়ের সঙ্গে নিজের পছন্দের চরিত্র ও গল্পের বিষয়ে আরও স্পষ্ট হয়েছেন তিনি। ‘পিঙ্ক’, ‘মুল্ক’, ‘থাপ্পড়’, ‘রাশমি রকেট’, ‘লুপ লাপেটা’, ‘হাসিন দিলরুবা’ কিংবা ‘ডাঙ্কি’ বিভিন্ন ঘরানার সিনেমায় অভিনয় করে নিজের পরিসর বাড়িয়েছেন এই অভিনেত্রী। ২০২৪ সালে ‘হাসিন দিলরুবা’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পর্দায় নিজের নারীসত্তা ও আকর্ষণকে নতুনভাবে আবিষ্কারের কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। তাপসীর মতে, বড় তারকার সঙ্গে অভিনয় করাটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং চরিত্রটি কতটা অর্থবহ, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ক্যারিয়ারের শুরুর দিনের অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতাগুলো তাই এখন তাঁর পথচলারই একটি অংশ। নিজের পছন্দের কাজ করার স্বাধীনতাকেই তিনি ধীরে ধীরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন