ডেঙ্গু হলে খাবার নিয়ে অনেকের মধ্যেই নানা ধরনের প্রশ্ন থাকে। জ্বর, বমি, শরীরব্যথা ও দুর্বলতার কারণে এ সময় স্বাভাবিক খাবার খেতে অনেকেরই কষ্ট হয়। তাই ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে একবারে বেশি খাবার না দিয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ানো ভালো। পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, স্যুপ ও অন্যান্য তরল শরীরে পানিশূন্যতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার শরীরকে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগাতে সহায়তা করে। তবে শুধু খাবারের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি।

ডেঙ্গু হলে খাবারের তালিকায় প্রথমেই গুরুত্ব দিতে হবে পর্যাপ্ত তরলকে। জ্বর বা বমির কারণে শরীর থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ কমে যেতে পারে। এ সময় বিশুদ্ধ পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, পাতলা স্যুপ, ফলের রস ও হালকা শরবত খাওয়া যেতে পারে। তবে ডায়াবেটিস থাকলে মিষ্টি পানীয় বা ফলের রসের পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। পাশাপাশি ভাত, খিচুড়ি, নরম রুটি, সেদ্ধ সবজি, ডিম, মাছ বা মুরগির মতো সহজপাচ্য খাবার রোগীর সহ্য অনুযায়ী দেওয়া যেতে পারে। ক্ষুধা কম থাকলে অল্প পরিমাণে কয়েকবার খাবার দেওয়াই তুলনামূলকভাবে সহজ।

শরীরের দুর্বলতা কাটাতে শুধু তরল নয়, পর্যাপ্ত পুষ্টিও প্রয়োজন। ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, দুধ বা সহনীয় অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। ফল ও সবজি থেকেও বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায়। তবে কোনো একটি ফল, শাক বা খাবার খেলেই দ্রুত প্লাটিলেট বেড়ে যাবে এমন ধারণার পক্ষে নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই প্লাটিলেট কমে গেলে নিজের মতো করে কোনো বিশেষ খাবার বা ওষুধের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা ও অন্য কোনো রোগ আছে কি না এসব বিবেচনায় খাবারের ধরনও ভিন্ন হতে পারে। 

ডেঙ্গু আক্রান্ত অবস্থায় কিছু খাবার কমিয়ে দেওয়া বা এড়িয়ে চলাও ভালো। অতিরিক্ত তেলযুক্ত, ভাজাপোড়া ও খুব মশলাদার খাবার অনেকের ক্ষেত্রে পেটের অস্বস্তি বাড়াতে পারে। একইভাবে খুব ভারী খাবার জোর করে খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই। খাবারের পাশাপাশি ওষুধের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। জ্বর বা শরীরব্যথার জন্য সাধারণত প্যারাসিটামল ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়, তবে ডোজ চিকিৎসকের পরামর্শ বা নির্দেশনা অনুযায়ী হওয়া উচিত। ডেঙ্গুতে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও CDC।

জ্বর কমে গেলেই যে ডেঙ্গু রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছেন, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। জ্বর কমার পরও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে গুরুতর ডেঙ্গুর সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত, রক্তবমি, কালো পায়খানা, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্থিরতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। WHO ও CDC উভয়েই এসব সতর্কতামূলক লক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেয়।

দেশে ডেঙ্গুর পরিস্থিতিও এ বছর উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে ২৮১ জনের মৃত্যু এবং ৯০ হাজার ৩৫৬ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৮৪ হাজার ২৯৯ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু হলে খাবার নিয়ে সচেতন থাকার পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি। ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো খাবারভিত্তিক চিকিৎসা নেই; তাই রোগীর অবস্থা খারাপ হলে শুধু ঘরোয়া খাবারের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।